ধর্ম ও মানবতার ইতিহাসে এমন অনেক মতবাদ দেখা গেছে যেগুলো মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, বরং ঐক্য স্থাপনের কথা বলে। “ইউনিভার্সালিজম (Universalism)” সেইরকম এক মতবাদ—যা বলে, ঈশ্বরের করুণা ও মুক্তি কেবল কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতির জন্য নয়, বরং সমস্ত মানবজাতির জন্যই উন্মুক্ত।
উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইউনিভার্সালিজম ধারণার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন খ্রিষ্টধর্মের ভেতরে। খ্রিষ্টধর্মের প্রারম্ভিক যুগেই কিছু ধর্মতত্ত্ববিদ যেমন অরিজেন (Origen of Alexandria) বিশ্বাস করতেন, নরক বা শাস্তি চিরস্থায়ী নয়; বরং একসময় সব আত্মাই ঈশ্বরের সঙ্গে পুনর্মিলিত হবে।
তবে সংগঠিত আকারে ইউনিভার্সালিজম একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে গড়ে ওঠে ১৮শ শতকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে।
১৭৭৯ সালে জন মারে (John Murray) নামের এক ধর্মপ্রচারক আমেরিকায় প্রথম “Universalist Church of America” প্রতিষ্ঠা করেন। এই চার্চের মূল শিক্ষা ছিল — “God is love, and all souls shall be saved” (ঈশ্বর ভালোবাসা, এবং সব আত্মা একদিন মুক্তি পাবে)।
মূল বিশ্বাস ও দর্শন
ইউনিভার্সালিজমের মূল ধারণা হলো —
- ঈশ্বরের ভালোবাসা সর্বজনীন ও সীমাহীন।
- কোনো মানুষ চিরস্থায়ীভাবে নরকে থাকবে না।
- সব ধর্মেই ঈশ্বরের সত্যের আভাস আছে।
- মানবতা, ন্যায়, এবং সহমর্মিতা ধর্মের আসল উদ্দেশ্য।
তাদের মতে, নরক বা স্বর্গ কোনো ভৌগোলিক স্থান নয়; এগুলো মানুষের মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রতীক। ঈশ্বরের করুণা এত মহান যে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক আত্মা তাঁর দিকে ফিরে যাবে।
ধর্মীয় চর্চা ও আধুনিক রূপ
ইউনিভার্সালিজম পরবর্তীকালে ইউনিটারিয়ানিজম (Unitarianism) মতবাদের সঙ্গে মিশে যায় এবং ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গঠিত হয় Unitarian Universalist Association (UUA)।
এই সংগঠন কোনো একক ধর্মগ্রন্থ বা নবীর অনুসারী নয়। তারা সব ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানের শিক্ষাকে মূল্য দেয় এবং মানবাধিকারের প্রতি গভীর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তাদের উপাসনালয়ে বাইবেল, কুরআন, বৌদ্ধ সূত্র, এমনকি কবিতাও পাঠ করা হয় — অর্থাৎ আধ্যাত্মিক মুক্তচিন্তাই এখানে প্রধান ভিত্তি।
সমাজ ও দর্শনে প্রভাব
ইউনিভার্সালিজম পশ্চিমা সমাজে মানবাধিকার, ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখে।
এ আন্দোলন থেকেই নারীর সমানাধিকার, দাসপ্রথা-বিরোধী আন্দোলন এবং যুদ্ধবিরোধী মানবিক চিন্তার বিকাশ ঘটে।
আজকের বিশ্বে অনেক নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী ও উদার চিন্তাবিদও ইউনিভার্সালিজমকে নৈতিক মানবতাবাদের ধর্মীয় রূপ বলে মনে করেন।
সমালোচনা ও বিতর্ক
রক্ষণশীল ধর্মতাত্ত্বিকরা মনে করেন, ইউনিভার্সালিজম পাপ ও নৈতিক শাস্তির ধারণাকে দুর্বল করে দেয়। যদি সব আত্মাই একদিন মুক্তি পায়, তাহলে ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য কোথায়?
তবে অনুসারীরা বলেন, তাদের ধর্ম পাপকে অস্বীকার করে না; বরং মনে করে, ভালোবাসা ও শিক্ষা দিয়ে শুদ্ধ হওয়াই মুক্তির পথ — ভয়ের মাধ্যমে নয়।
উপসংহার
ইউনিভার্সালিজম হলো মানবতার এক সামগ্রিক দর্শন, যা ধর্মের সীমারেখা ভেঙে সব মানুষকে এক ঈশ্বরীয় বন্ধনে আবদ্ধ করতে চায়।
এটি এমন এক বিশ্বাসব্যবস্থা যা বলে— “সত্য এক, পথ অনেক।”
মানুষের ধর্মীয়, বর্ণগত বা সাংস্কৃতিক পার্থক্য যতই থাকুক না কেন, সব আত্মার গন্তব্য একটাই—ঈশ্বরের আলোকিত ভালোবাসা।








Leave a Reply to 益群网 Cancel reply