বোরকা কখনোই মুসলমানদের নিজস্ব বা মৌলিক পোশাক ছিল না। এটি মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য অঞ্চলের একটি প্রাচীন সামাজিক–সাংস্কৃতিক পোশাক, যার উৎপত্তি ইসলাম আগমনের বহু শতাব্দী আগে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বোরকার ধারণাটি মূলত ইহুদি, খ্রিস্টান ও পারস্য সভ্যতার নারীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।
এই সমাজগুলিতে একসময় রাস্তার পতিতাদেরও বোরকা পরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত খদ্দের আকৃষ্ট করার জন্য। এছাড়া বোরকার অন্তরালে অনেক কিছু লুকানো সম্ভব — সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কেউ কেউ সোনার দোকান থেকে গয়না, আবার কেউ প্রসাধনীর দোকান থেকে দামি কসমেটিকস চুরি করে ধরা পড়েছেন। এমনকি বোরকার আড়ালে লুকিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ঘটনাও বহুবার প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন ভিডিওতে।
এক শ্রেণির ভণ্ড লোক দাবি করে যে, নারীর শরীর দেখলে পুরুষের কামোদ্রেক জাগে— তাই নারীদের বোরকা পরা বাধ্যতামূলক করা উচিত। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, সম্প্রতি এমন এক তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে, যার শরীরেও বোরকা ছিল।
বোরকার প্রাচীন ইতিহাস
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০–৬০০ বছর পূর্বে পারস্য সাম্রাজ্যের নারীরা “চাদরি” বা পর্দাযুক্ত পোশাক ব্যবহার করতেন। এই প্রথা ছিল ধর্মীয় নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা ও রোদ–ধুলা থেকে রক্ষার জন্য।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যেও (খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিষ্টীয় দশম শতক পর্যন্ত) উচ্চবিত্ত নারীদের পর্দা বা মুখঢাকা পোশাক পরার প্রচলন ছিল। এই সাম্রাজ্যই পরবর্তীতে ইসলাম আগমনের পূর্বে আরব সমাজে সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করে।
ইহুদি ধর্মগ্রন্থ হালাচা (Halakha)–তেও নারীদের চুল ঢেকে রাখার নির্দেশ রয়েছে: বিয়ের পর নারী চুল প্রকাশ করতে পারবেন না। এটি ইসলাম আসার প্রায় দুই হাজার বছর আগের নিয়ম। খ্রিস্টান নারীরাও প্রাচীনকাল থেকে মাথা ও শরীর ঢেকে রাখতেন।
অর্থাৎ, বোরকা বা পর্দা ছিল ইহুদি–খ্রিস্টান–পারস্য সমাজের অংশ, ইসলামী উদ্ভাবন নয়।
ইসলাম ও পর্দা: কোরআনের নির্দেশ বনাম সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
কোরআনে “বোরকা” শব্দটির উল্লেখ কোথাও নেই। ইসলাম নারীদের পর্দা বা শালীনতা বজায় রাখতে বলে (সূরা আন–নূর ২৪:৩০–৩১), কিন্তু নির্দিষ্ট পোশাকের নাম বা রং বা আকার নির্ধারণ করে না।
এই ধারণা পরবর্তীকালে আরবের গরম আবহাওয়া, ধুলাবালি এবং সামাজিক রীতি অনুসারে বিকশিত হয়। ইসলাম পর্দার নীতিকে নৈতিকতা ও নম্রতার সঙ্গে যুক্ত করেছে, কিন্তু “বোরকা”কে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে ঘোষণা করেনি।
আধুনিক বোরকা ও ঔপনিবেশিক প্রভাব
বর্তমান কালো রঙের আধুনিক বোরকার উৎপত্তি ১৮শ শতকে ভারতের গুজরাটে, যেখানে মুসলিম উচ্চবিত্ত নারীরা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে এটি পরতেন। পরবর্তীকালে উপনিবেশিক যুগে এটি মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্যগত দিক
বোরকা দীর্ঘক্ষণ পরিধানের কারণে সূর্যালোকের অভাব থেকে ভিটামিন–ডি–এর ঘাটতি, অস্টিওপোরেসিস, হাড় দুর্বলতা, এমনকি মানসিক ক্লান্তি ও উচ্চরক্তচাপের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে — এ নিয়ে ইরান ও জর্ডানের চিকিৎসা গবেষণায়ও সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে।
সামাজিক প্রভাব ও বিতর্ক
বাংলাদেশে ১৯৯০–এর দশক থেকে কিছু ধর্মীয় সংগঠন বোরকাকে “ধর্মীয় পোশাক” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। অথচ বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত নারীরা — কৃষাণী, শ্রমজীবী, শিক্ষিতা — শত বছর ধরে শাড়ি পরেছেন এবং সামাজিক মর্যাদায় পিছিয়ে ছিলেন না।
বোরকাকে কখনও কখনও রাজনৈতিক প্রতীক বা সামাজিক চাপের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। নারীর স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও শারীরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে এটি আজ এক বিতর্কিত বিষয়।
ধর্ম ও নৈতিকতা: মূল শিক্ষা
ধর্ম কখনোই পোশাক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো নৈতিকতা, সততা ও সংযম। কোরআনে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; তিনি তোমাদের অন্তর ও কর্মের দিকে তাকান।” (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২৫৬৪)
অতএব, নারীর পোশাক নয় — তার চরিত্র, মানবিকতা ও স্বাধীনতাই আসল ধর্মীয় মর্যাদার মানদণ্ড।
উপসংহার
বোরকা কোনো মুসলিম উদ্ভাবন নয় — এটি একটি ঐতিহাসিক পোশাক, যার শিকড় হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতায়। ধর্মকে পোশাকের আড়ালে বন্দি করা মানে মানবিকতার প্রকৃত শিক্ষাকে উপেক্ষা করা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মর্যাদা — পোশাক নির্ভর ধর্মীয়তা নয়।
দেখুন:
- Cambridge History of Iran, Britannica
- Corinthians 11:5–6, বাইবেল
- Iranian Journal of Public Health, 2018; Jordan Medical Association Review, 2020








Leave a Reply