আমাদের সমাজে “আমল” শব্দটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। কেউ কাউকে পরামর্শ দেয়, “ভাই, এই দোয়াটা আমল করুন”, বা “এই আয়াতটা নিয়মিত পড়ুন, আমল করলে উপকার পাবেন।” কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমল বলতে আসলে আমরা কী বুঝি?
অনেককে দেখেছি, সারাদিন তজবী জপতে, আবার তজবী রেখে বা হাতে নিয়েই সেই মুখে অন্যের গীবত করতে।
একজন মানুষ ৫০০ দানার তজবী বানিয়ে দীর্ঘক্ষণ বিভিন্ন দোয়া জপে। পারিপার্শ্বিক জরুরী প্রয়োজনেও- যেমন কোনো শিশু বিপজ্জনক অবস্থায় পতিত হচ্ছে, সেটার দিকেও খেয়াল নেই। তার ধারণা শিশুকে রক্ষা করার চেয়ে তার “আমলই” জরুরী। তাকে একবার প্রশ্ন করা হলো, আমল অর্থ কি? অর্থাৎ “আমরা যখন বলি, এটা আমল করো, ওটা আমল করো— ‘আমল’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী?”
তিনি উত্তর দিলেন, “দোয়া বা আল্লাহর কালাম নিরবে পাঠ করাকেই আমল বলে।”
শুনে প্রশ্নকারী বললেন, “না, আমল মানে শুধু পাঠ নয়; বরং যেটা তুমি পাঠ করছো, সেটার নির্দেশ বা বার্তা বাস্তবে অনুসরণ করাটাই আসল আমল।”
‘আমল’ শব্দের মূল অর্থ
‘আমল’ (عمل) শব্দটি এসেছে আরবি মূল ‘عَمِلَ’ থেকে, যার অর্থ — কাজ করা, কার্য সম্পাদন করা, বাস্তবায়ন করা।
অর্থাৎ, আমল মানে কোনো তত্ত্ব বা জ্ঞানকে কর্মে রূপ দেওয়া।
কোনো কিছু জানা বা মুখে বলাই যথেষ্ট নয়; সেটা হৃদয়ে গ্রহণ করে জীবনে প্রয়োগ করাই প্রকৃত আমল।
প্রচলিত ভাষায় আমলের অর্থ
বাংলা ও প্রশাসনিক ভাষায়ও আমরা দেখি,
- আদালতের ভাষায় বলা হয়: “মামলাটি আমলে নেওয়া হয়েছে” — অর্থাৎ মামলাটি এখন থেকে কার্যকর প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে, তদন্ত ও বিচার শুরু হবে।
- পুলিশের ভাষায় বলা হয়: “ঘটনাটি আমলে নেওয়া হয়েছে” — অর্থাৎ ঘটনার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উভয় ক্ষেত্রেই “আমলে নেওয়া” মানে কোনো বিষয়কে বাস্তব কর্মধারায় অন্তর্ভুক্ত করা।
কেবল রেকর্ডে রাখা নয়, বরং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিতে আমলের প্রকৃত তাৎপর্য
ধর্মীয় জীবনে আমরা প্রায়ই দোয়া, জিকির, তাসবিহ পাঠ করি। এগুলো নিঃসন্দেহে আল্লাহর স্মরণ, যা আত্মাকে প্রশান্ত করে। কিন্তু যদি সেই পাঠ আমাদের আচরণ, ন্যায়বোধ, নীতিনিষ্ঠা ও মানবিকতা পরিবর্তন না করে— তবে সেটি পূর্ণাঙ্গ আমল নয়, বরং আংশিক এক অনুশীলন।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন—
“যে কেউ ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে (আমলে সালেহ), আমি তার কর্ম বিফল হতে দেব না।”
— সূরা আল-কাহফ, ১৮:৩০
এখানে “সৎকর্ম” বা “আমলে সালেহ” মানে কেবল নামাজ পড়া বা তাসবিহ জপা নয়; বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সৎ আচরণ, অন্যায়ের বিরোধিতা, দানশীলতা— সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
শুধু পাঠ নয়, প্রয়োগই আসল
কুরআন পাঠ করা মহান কাজ। কিন্তু কুরআন পাঠের উদ্দেশ্য শুধু শব্দ উচ্চারণ নয়; বরং সেই বাণীর আদর্শকে জীবনে রূপ দেওয়া। যেমন একজন চিকিৎসক যদি চিকিৎসাবিজ্ঞান মুখস্থ করে ফেলেন কিন্তু রোগীকে চিকিৎসা না দেন, তবে তার জ্ঞান কোনো বাস্তব মূল্য রাখে না। তেমনি, ধর্মীয় জ্ঞানও তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন সেটি আমলে রূপ নেয়।
আমল: পাঠ ও প্রয়োগের সমন্বয়
আমল আসলে দুই ধাপে সম্পূর্ণ হয়:
- জ্ঞানার্জন ও উপলব্ধি — কী বলা হয়েছে, কেন বলা হয়েছে, তা বোঝা।
- বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ — সেই নির্দেশনা নিজের জীবনে, পরিবারে ও সমাজে প্রয়োগ করা।
এই দুই ধাপ একে অপরের পরিপূরক। পাঠ ছাড়া আমল অন্ধ, আর আমল ছাড়া পাঠ নিরর্থক।
মূল কথা
আমল মানে শুধু আল্লাহর বাণী মুখে উচ্চারণ নয়; বরং সেটার আলোকে নিজের জীবন পরিচালনা করা।
যে কুরআন আমরা পড়ি, তা যেন কেবল ঠোঁটে না থাকে— হৃদয়ে প্রবেশ করুক, কর্মে প্রতিফলিত হোক।
আমল তখনই প্রকৃত আমল, যখন তা মানুষ ও সমাজে কল্যাণ বয়ে আনে।
“যারা শুনে উত্তম কথায় সাড়া দেয়, তারাই সেই লোক, যাদের আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেছেন।”
— সূরা আয-যুমার, ৩৯:১৮








Leave a Reply