উগ্র ধর্মান্ধ তৌহিদী জনতার নামে খলিফা উসমান (রাঃ) হত্যাকাণ্ড
ইতিহাসের এক গভীর ও বেদনাদায়ক অধ্যায় হলো তৃতীয় খলিফা উসমান ইবন আফফান (রাঃ)-এর হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনাই ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম গৃহযুদ্ধের বীজ বপন করে। ধর্মের নামে উদ্ভূত উগ্র গোষ্ঠী—যাদের আত্মপরিচয় ছিল “তৌহিদী” বা “খাঁটি ঈমানদার”—তারা মূলত রাজনৈতিক প্ররোচনা ও বিকৃত ব্যাখ্যার ফাঁদে পড়ে ইসলামী ঐক্যের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
খলিফা উসমান (রাঃ) ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের এক ধনবান ও উদার সাহাবী এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের তৃতীয় খলিফা। তিনি কুরআনের সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নতুন সংস্কার আনেন। কিন্তু তাঁর শাসনামলের শেষভাগে কিছু গভর্নরের দুর্নীতি, মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র এবং তথাকথিত ‘তৌহিদী’ আন্দোলনের বিকৃত প্রচার একত্রে সমাজে বিভাজন তৈরি করে।
‘তৌহিদী’ আন্দোলনের উগ্র বিকৃতি
এই গোষ্ঠীগুলো দাবি করত—তারা একমাত্র ‘খাঁটি ঈমান’ রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। বাস্তবে তারা ধর্মের ভাষায় রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিচ্ছিল। তারা উসমান (রাঃ)-এর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোকে “বেদআত” বা “অবৈধ” বলে ঘোষণা করে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করেছিল।
হত্যাকাণ্ড ও তার পরিণতি
খলিফা উসমান (রাঃ)-এর বাড়ি অবরোধ করে তাঁকে পানি ও খাদ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়। অবশেষে ৩৫ হিজরিতে বিদ্রোহীরা তাঁকে হত্যা করে। তাঁর হাতে তখনও কুরআন ছিল—একটি পবিত্র প্রতীক, যা মুসলিম সমাজে বিভাজনের চিহ্ন হয়ে ওঠে। এই হত্যাকাণ্ডের পর মুসলিম সমাজে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ, যার পরিণতিতে খলিফা আলী (রাঃ)-এর যুগে ‘জমল’ ও ‘সিফফিন’ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
প্রভাব
এই ঘটনা ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে একটি শিক্ষণীয় বার্তা দেয়—ধর্ম যখন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন তা সমাজে বিভেদ, সহিংসতা ও অবক্ষয় ডেকে আনে। তথাকথিত ‘তৌহিদী’ গোষ্ঠী তখন যেমন ধর্মের নামে খলিফাকে হত্যা করেছিল, আজও একই মানসিকতা বিশ্বজুড়ে বিভাজন সৃষ্টি করছে।
উপসংহার
খলিফা উসমান (রাঃ)-এর শহীদ হওয়া কেবল একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়; এটি ছিল এক যুগের সমাপ্তি ও নতুন বিভেদের সূচনা। ইতিহাস আমাদের শেখায়—ধর্মের নামে অহংকার ও উগ্রতার পথ যতই পবিত্র মনে হোক না কেন, তার ফল কখনোই কল্যাণকর নয়। ইসলামের মূল শিক্ষা ন্যায়, সহনশীলতা ও ঐক্যের—যা উসমান (রাঃ)-এর জীবন ও মৃত্যু উভয়েই স্মরণ করিয়ে দেয়।
উদ্ধৃতি:
“তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং ভ্রাতাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করো না।” — আল কুরআন ৮:১
“যে মুসলমানের প্রতি অস্ত্র তোলে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” — নবী মুহাম্মদ (সাঃ)








Leave a Reply