সুন্নী ইসলামের হানাফী মতবাদ: যুক্তি ও সহিষ্ণুতার পথ
সারাংশ:
ইসলামের সুন্নী ধারার মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও পুরোনো মতবাদ হলো হানাফী মাজহাব। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর প্রবর্তিত এই মতবাদ যুক্তি, বাস্তবতা ও সমাজকল্যাণের ভিত্তিতে ইসলামী আইন ব্যাখ্যা করে। দক্ষিণ এশিয়া ও তুর্কি-আরব জগতে এর ব্যাপক প্রভাব আজও বিদ্যমান। অটোমান সাম্রাজ্যের সময়ে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারব্যবস্থার ভিত্তি ছিল হানাফী ফিকহ, যার উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে।
হানাফী মতবাদ এই অঞ্চলের মানুষের কাছে অপরিচিত নয়, তবে যাঁরা মাদ্রাসা লাইনে পড়াশুনা করেন নাই, তাদের অনেকের কাছেই এর আদ্যপান্ত জানা হয়তো সম্ভব হয় না, তাই এই সিরিজের অন্তর্ভূক্ত করেছি।
হানাফী মতবাদের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক পটভূমি
সুন্নী ইসলামে চারটি প্রধান ফিকহি মতবাদ আছে — হানাফী, মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী। এর মধ্যে হানাফী মতবাদ সবচেয়ে পুরোনো এবং প্রভাবশালী। এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা (নু‘মান ইবন সাবিত, ৬৯৯–৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন কুফা (ইরাক)-এর অধিবাসী।
তিনি ইসলামী আইনে যুক্তির প্রয়োগে অগ্রদূত। যখন কোনো বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে সরাসরি নির্দেশ নেই, তখন তিনি যুক্তি, নীতি ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এজন্য তাঁর ফিকহ পদ্ধতি পরিচিত হয় “রায়ভিত্তিক ফিকহ (Fiqh al-Ra’y)” নামে।
হানাফী মতবাদের মূল নীতিমালা
- কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি আনুগত্য:
ইসলামী আইনের প্রাথমিক উৎস কুরআন ও হাদীস। তবে যদি কোনো বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশ না থাকে, তখন যুক্তি ও কিয়াসের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। - কিয়াস (Analogical Reasoning):
একটি প্রতিষ্ঠিত বিধানের সঙ্গে তুলনা করে নতুন বিধান নির্ধারণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, মদ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ (মাতলামি) থেকে অন্যান্য মাদকদ্রব্য নিষিদ্ধ ঘোষণা। - ইস্তিহসান (Equity and Preference):
কঠোর আইনি ব্যাখ্যার পরিবর্তে মানবিকতা ও ন্যায়বোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এটি হানাফী ফিকহের অন্যতম মানবিক বৈশিষ্ট্য। - ইজমা (সম্মিলিত মত):
আলেমদের সম্মিলিত মতামতকে শরীয়তের একটি বৈধ উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়। - প্রয়োগে নমনীয়তা:
সমাজের সংস্কৃতি, জলবায়ু ও প্রেক্ষাপট অনুসারে আইন প্রয়োগে নমনীয়তা রাখা হয়েছে — যা দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে হানাফী মতবাদকে টিকিয়ে রেখেছে।
ভূগোল ও প্রভাবের বিস্তার
হানাফী মতবাদের অনুসারী আজ পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ।
প্রধান অঞ্চলসমূহ:
- বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান
- তুরস্ক, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান
- ইরাক, সিরিয়া ও বলকান অঞ্চলের কিছু অংশ
ধর্মচর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মুসলমানদের ধর্মচর্চা সাধারণত সহিষ্ণু, মধ্যপন্থী ও যুক্তিনির্ভর। নামাজ, রোজা, জাকাত, উত্তরাধিকার ও বিবাহ–সব ক্ষেত্রেই সামাজিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই মতবাদের জন্যই দক্ষিণ এশিয়া ইসলামের এক শান্ত ও মানবিক রূপ প্রকাশ করতে পেরেছে — যেখানে ধর্ম শুধু আচার নয়, বরং সমাজজীবনের ন্যায়বোধ ও সংস্কৃতির অংশ।
উপসংহার
ইমাম আবু হানিফা যুক্তির সঙ্গে বিশ্বাসের এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন।
তাঁর মতে, ধর্ম মানে শুধু বিধান নয়, ন্যায়বোধ ও সমাজকল্যাণের উপযুক্ত প্রয়োগ।
হানাফী মতবাদ তাই ইসলামের এমন এক ধারা, যেখানে যুক্তি, মানবিকতা ও সহিষ্ণুতা একই সূত্রে গাঁথা।








Leave a Reply