বিশ্ব ইতিহাসে এমন কিছু যুদ্ধ আছে, যেখানে শত্রুর শক্তির চেয়ে নিজের ভুল সিদ্ধান্তই বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। তেমনই একটি ঘটনা ঘটে ১৯০৪–০৫ সালের রাশিয়া-জাপান যুদ্ধে। রুশ সাম্রাজ্যের একটি ভুল কৌশলগত সিদ্ধান্ত পুরো নৌবহরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
রাশিয়ার জার শাসিত সরকার তখন পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এর ফলেই জাপানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাশিয়া তাদের বাল্টিক নৌবহরকে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পূর্ব এশিয়ায় পাঠায়, যাতে জাপানের নৌবাহিনীকে মোকাবিলা করা যায়। এই নৌবহরটি ইতিহাসে পরিচিত ছিল দ্বিতীয় প্যাসিফিক স্কোয়াড্রন নামে।
কিন্তু সমস্যার শুরু হয় যাত্রাপথেই। রুশ নৌবাহিনীর কমান্ডার অ্যাডমিরাল জিনোভী রোজহেস্টভেনস্কী (Zinovy Rozhestvensky) অত্যন্ত চাপে ছিলেন। ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রায় নাবিকদের মনোবল কমে যায়, সরঞ্জাম ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়। এমনকি পথিমধ্যে তারা ভুলবশত ব্রিটিশ মাছধরা জাহাজে গুলি চালায়—যা “ডগার ব্যাংক ঘটনা” নামে পরিচিত। ফলে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
অবশেষে ১৯০৫ সালের মে মাসে রুশ নৌবহর জাপানের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু তারা যে কৌশল নেয়, সেটিই ছিল আত্মঘাতী। তারা সরাসরি সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যেখানে জাপানি নৌবাহিনী আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। জাপানের নৌবাহিনী, অ্যাডমিরাল Tōgō Heihachirō–এর নেতৃত্বে, দ্রুত ও সুসংগঠিত আক্রমণ চালায়।
এই সংঘর্ষই ইতিহাসে পরিচিত Battle of Tsushima নামে।
ফলাফল ছিল ভয়াবহ। রাশিয়ার প্রায় পুরো নৌবহর ধ্বংস হয়ে যায়—অনেক জাহাজ ডুবে যায়, বহু নাবিক নিহত বা বন্দি হয়। কয়েকটি জাহাজ আত্মসমর্পণ করে, আর মাত্র অল্পসংখ্যক পালাতে সক্ষম হয়। ইতিহাসে এটি অন্যতম লজ্জাজনক ও বিধ্বংসী নৌ-পরাজয় হিসেবে বিবেচিত।
কেন এটি “একটি ভুল আদেশ”-এর উদাহরণ?
- সংকীর্ণ জলপথ বেছে নেওয়া ছিল বড় কৌশলগত ভুল।
- দীর্ঘ যাত্রার পর ক্লান্ত ও অপ্রস্তুত নৌবহরকে সরাসরি শক্তিশালী শত্রুর মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল।
- শত্রুর সক্ষমতা ও নিজস্ব সীমাবদ্ধতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
এই ঘটনার পরিণতিতে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ আরও বাড়ে এবং তা পরবর্তীতে ১৯০৫ সালের বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে।
শিক্ষা
এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়—যুদ্ধে শুধু অস্ত্র বা সংখ্যাই নয়, সঠিক সিদ্ধান্ত, সময়োপযোগী কৌশল ও বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নই বিজয়-পরাজয়ের মূল নির্ধারক। একটি ভুল আদেশ কখনো কখনো পুরো নৌবহর, এমনকি একটি সাম্রাজ্যের মর্যাদাকেও ডুবিয়ে দিতে পারে।
আরও পড়ুনঃ
১। যুদ্ধক্ষেত্রে বেহালা বাজিয়ে সৈন্যদের বাঁচানো: ১৯১৪ সালের ক্রিসমাস ট্রুসের মানবিক গল্প
২। একজন মানুষ কীভাবে একটি ঘাঁটি দখল করেঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক অবিশ্বাস্য সাহসিকতার কাহিনি








Leave a Reply