রিফর্ম জুডাইজম: আধুনিকতা, মানবিকতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পথে একটি আন্দোলন
রিফর্ম জুডাইজম, যাকে Progressive Judaism বা Liberal Judaism-ও বলা হয়। এটি আধুনিক ইহুদিবাদের সবচেয়ে উদার ও মানবিক ব্যাখ্যা-ভিত্তিক ধারাগুলোর একটি। এটি ১৯শ শতকে ইউরোপে জন্ম নেয়—যখন পশ্চিমা বিশ্বে আলোকায়ন (Enlightenment), বিজ্ঞান, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ধারণা দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছিল। ওই পরিবেশে অনেক ইহুদি মনে করলেন যে কঠোর রাব্বিনিক আইন (Halakha) ও ঐতিহ্য আধুনিক সমাজের সাথে মানানসই নয়। ফলে শুরু হল এক নতুন ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন—Reform Judaism।
এ আন্দোলনের মূল দাবি ছিল:
ধর্ম স্থির নয়; সমাজের পরিবর্তনের সাথে সাথে ধর্মীয় চর্চাকেও যুক্তিবাদী, মানবিক ও নৈতিক দৃষ্টিতে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
উৎপত্তি ও বিকাশ
রিফর্ম জুডাইজমের শিকড় ১৮০০–এর দশকে জার্মানি ও পশ্চিম ইউরোপে।
আলোকায়নের ফলে ইহুদিদের নাগরিক অধিকার বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তারা মূলধারার সমাজে প্রবেশ করছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিল। ফলে কঠোর ধর্মীয় আইন অনেকের কাছে বাধা মনে হতে থাকে।
পরবর্তীতে এই আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। আজ Reform Judaism উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইহুদি সম্প্রদায়গুলোর একটি।
মূল বিশ্বাস ও বৈশিষ্ট্য
১. ধর্মীয় আইন (Halakha) বাধ্যতামূলক নয় — নৈতিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
রিফর্ম আন্দোলনের মতে Halakha হলো অনুপ্রেরণা, কিন্তু বাধ্যতামূলক বিধান নয়।
ব্যক্তি নিজের বিবেক, যুক্তি ও নৈতিক মূল্যবোধ অনুযায়ী ধর্ম পালন করবেন।
২. ব্যক্তিগত স্বাধীনতা (Personal Autonomy)
ইহুদিবাদ কীভাবে পালন করবেন, কোন আচার মানবেন—
এটি ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
এ জন্য একে “Progressive” বলা হয়।
৩. উপাসনার আধুনিকীকরণ
- পূজায় স্থানীয় ভাষা ব্যবহার
- মিকভে, কোশের নিয়ম বা কঠোর পোশাকবিধি বাধ্যতামূলক নয়
- বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার
- পুরুষ–নারী একসাথে উপাসনা
এগুলো রিফর্ম ইহুদিদের নিয়মিত চর্চা।
৪. নারীর সম্পূর্ণ সমঅধিকার
রিফর্ম জুডাইজম হলো ইহুদিবাদের প্রথম ধারা যা—
- নারীকে রাব্বি, ক্যান্টর, সমাজনেতা হওয়ার পূর্ণ অধিকার দেয়
- ধর্মীয় পাঠমানতে পুরুষের সমান ভূমিকা দেয়
এটি জুডাইজমে একটি বড় সামাজিক বিপ্লব ঘটায়।
৫. LGBTQ+ অন্তর্ভুক্তি
বিশ্বের প্রথম ধর্মীয় ধারাগুলোর মধ্যে একটি যারা—
- সমলিঙ্গ বিবাহকে স্বীকৃতি দেয়
- LGBTQ+ রাব্বি নিয়োগ করে
- বৈষম্যকে নৈতিকভাবে ভুল বলে ঘোষণা করে
৬. ইসরায়েলের বিষয়ে উদার দৃষ্টিভঙ্গি
রিফর্ম ধারার মধ্যে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে সমর্থন থাকলেও তা
ধর্মীয় পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি নয়।
কিছু ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান প্রগতিশীল বা মানবাধিকারভিত্তিক।
৭. সামাজিক ন্যায়বিচার (Tikkun Olam)
রিফর্ম জুডাইজমে সামাজিক দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দারিদ্র্য, সমতা, মানবাধিকার—এসব বিষয়ে অবস্থান অত্যন্ত সক্রিয়।
রিফর্ম জুডাইজম বনাম অর্থডক্স
| বিষয় | অর্থডক্স জুডাইজম | রিফর্ম জুডাইজম |
| Halakha | বাধ্যতামূলক | ঐচ্ছিক ও ব্যাখ্যাযোগ্য |
| লিঙ্গভূমিকা | পুরুষ-প্রধান | সম্পূর্ণ সমতা |
| ধর্মীয় চর্চা | প্রাচীন আচার কঠোরভাবে মানা | আধুনিক ব্যাখ্যা ও স্বাধীনতা |
| সমাজ ও রাষ্ট্র | রক্ষণশীল অবস্থান | প্রগতিশীল অবস্থান |
রিফর্ম ধারার কাছে নৈতিকতা ও মানবিকতা—ধর্মীয় আইনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাপী প্রভাব
রিফর্ম জুডাইজম আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বহু দেশে প্রতিষ্ঠিত।
মার্কিন ইহুদিদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই ধারার অনুসারী।
এদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো—
- Hebrew Union College
- Union for Reform Judaism
- World Union for Progressive Judaism
বিশ্বব্যাপী ধর্ম, শিক্ষা ও সামাজিক কাজে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছে।
সমালোচনা
রিফর্ম জুডাইজম বিশেষত অর্থডক্স ইহুদিদের কাছ থেকে কিছু সমালোচনার মুখোমুখি হয়—
- ধর্মীয় আইনকে অতিরিক্ত শিথিল করা
- আধুনিকতার চাপে ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত করা
- ইহুদি পরিচয়ের দুর্বলতা
ইত্যাদি।
তবে রিফর্ম ধারার যুক্তি—
আসল ইহুদি মূল্যবোধ হলো নৈতিকতা, মানবিকতা ও আত্মসমালোচনা।
উপসংহার
রিফর্ম জুডাইজম ইহুদিবাদের এক আধুনিক, উদার, মানবিক এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে।
এ ধারার মূল শক্তি হলো নৈতিকতা, যৌক্তিকতা, সমতা, এবং সামাজিক ন্যায়বিচার—যা আধুনিক বিশ্বের মূল্যবোধের সাথে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।








Leave a Reply