খিয়াং বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, যারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে। তাদের বসতি সাধারণত পাহাড়ের ঢাল বা উঁচু স্থানে গড়ে ওঠে। স্বল্পসংখ্যক হওয়ার কারণে তারা সাংস্কৃতিক ও ভাষাগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত।
আগমন ও উৎপত্তি
খিয়াং জনগোষ্ঠী তিব্বত-বার্মা ভাষাপরিবারভুক্ত এবং কুকি-চিন গোষ্ঠীর অন্তর্গত। ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয়, তাদের পূর্বপুরুষরা কয়েক শতাব্দী আগে বর্তমান মিয়ানমারের পার্বত্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে। পাহাড়কেন্দ্রিক জীবনধারা ও আত্মনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা তাদের সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলে।
ভাষা
খিয়াং ভাষা তিব্বত-বার্মা পরিবারের একটি স্বতন্ত্র ভাষা। ভাষাটির একাধিক উপভাষা রয়েছে। লিখিত রূপ খুব সীমিত; মৌখিক ঐতিহ্যই ভাষা সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম। বর্তমানে বাংলা ভাষার প্রভাব দ্রুত বাড়ছে, ফলে মাতৃভাষা সংকটের মুখে।
ধর্ম ও বিশ্বাস
ঐতিহাসিকভাবে খিয়াংরা প্রাণবাদী (Animism) বিশ্বাসে আস্থাশীল ছিল। তারা প্রকৃতি, পাহাড়, বন ও পূর্বপুরুষের আত্মাকে শ্রদ্ধা করত।
বর্তমানে—
(১) একটি অংশ বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করে।
(২) আরেকটি অংশ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে।
ধর্মীয় পরিবর্তন হলেও লোকবিশ্বাস, পূর্বপুরুষপূজা ও ঐতিহ্যগত আচার এখনো অনেক ক্ষেত্রে টিকে আছে।
জীবনযাপন ও অর্থনীতি
(১) ঐতিহ্যগত প্রধান জীবিকা: জুম চাষ
(২) ধান, মরিচ, কুমড়া, ভুট্টা প্রভৃতি চাষ করা হয়।
(৩) বনজ সম্পদ সংগ্রহ, বাঁশ ও কাঠের কাজও গুরুত্বপূর্ণ।
(৪) ঘরবাড়ি সাধারণত বাঁশ ও কাঠ দিয়ে উঁচু মাচার ওপর নির্মিত হয়, যাতে বন্যপ্রাণী ও বৃষ্টির পানি থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।
পোশাক ও সংস্কৃতি
(১) নারীরা ঐতিহ্যবাহী বোনা কাপড় পরিধান করে, যা সাধারণত রঙিন ও নকশাযুক্ত।
(২) পুরুষদের পোশাক তুলনামূলক সরল।
(৩) বয়নশিল্প খিয়াং নারীদের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
(৪) লোকগান, নৃত্য ও উৎসব সামাজিক জীবনের অংশ।
(৫) সামষ্টিক ভোজ ও উৎসব পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করে।
সামাজিক কাঠামো
(১) খিয়াং জনগোষ্ঠীর সমাজ পিতৃতান্ত্রিক।
(২) গোষ্ঠীপ্রধান বা প্রবীণদের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ।
(৩) পারিবারিক ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রথা প্রচলিত।
বিবাহ প্রথা
(১) সাধারণত পারিবারিক সম্মতির মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
(২) একই গোষ্ঠীর ভেতরে বিবাহ বেশি প্রচলিত, তবে এখন পরিবর্তন হচ্ছে।
(৩) বিবাহ অনুষ্ঠানে ধর্মীয় আচার, আশীর্বাদ ও সামাজিক ভোজ গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিক্ষা ও আধুনিক পরিবর্তন
(১) দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শিক্ষার সুযোগ দীর্ঘদিন সীমিত ছিল।
(২) বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তৃত হচ্ছে।
(৩) তরুণ প্রজন্ম শহরমুখী হচ্ছে, ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ
(১) মাতৃভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকি
(২) ভূমি ও জীবিকাগত সমস্যা
(৩) শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা
(৪) সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের সংকট
আনুমানিক জনসংখ্যা
বাংলাদেশে খিয়াং জনগোষ্ঠীর আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ৩–৪ হাজার বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুনঃ চাক (Chak / Sak) জনগোষ্ঠীর ইতিহাস







Leave a Reply