বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠী নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে উপলব্ধি হলো, প্রত্যেকটা জাতিগোষ্ঠী প্রায় একই আচারে অভ্যাস্ত। তেমনি একটি ক্ষুদ্র সম্প্রদায় খুমি জনগোষ্ঠী।
খুমি জনগোষ্ঠী ১৭শ শতকের শেষভাগে আরাকান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে। গোষ্ঠীগত দাংগার কারণে খুমীদের একটি অংশ মায়ানামার হতে পালিয়ে এসে বান্দরবানের গহিন অরণ্যে বসবাস করতে শুরু করে। আবার অনেকের মতে খুমি আদিবাসীরা মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীভুক্ত একটি দল। তারা প্রধানত তিব্বতি বার্মিজ-কুকি-চীন ভাষায় কথা বলে।
বর্তমানে বাংলাদেশের খুমি জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলা-র দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে। খুমি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার-এর রাখাইন অঞ্চলেও বসবাস করে।
ভাষা
খুমিরা খুমি ভাষায় কথা বলে, যা তিব্বত-বর্মী ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাদের ভাষা মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর নির্ভরশীল; দীর্ঘদিন লিখিত রূপের প্রচলন সীমিত ছিল। বর্তমানে ভাষা সংরক্ষণে কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, তবে তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
জীবনযাপন ও সংস্কৃতি
খুমি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত পেশা হলো জুমচাষ। পাহাড়ের ঢালে ধান, ভুট্টা, মরিচ, কচু ইত্যাদি চাষ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। পাশাপাশি শিকার, মাছধরা ও বনজ সম্পদের ওপরও তাদের নির্ভরতা রয়েছে।
তাদের সমাজব্যবস্থা গোত্রভিত্তিক এবং প্রবীণদের নেতৃত্বে পরিচালিত। সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে প্রকৃতি ও পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের রীতি রয়েছে। বর্তমানে অনেক খুমি বৌদ্ধধর্ম বা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও ঐতিহ্যগত বিশ্বাসের প্রভাব এখনো বিদ্যমান।
পোশাক ও ঐতিহ্য
খুমি নারীদের বস্ত্রবয়ন শিল্প উল্লেখযোগ্য। তারা নিজস্ব নকশায় বোনা পোশাক পরিধান করেন। পুরুষরাও ঐতিহ্যবাহী সরল পোশাক ব্যবহার করেন। উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানে রঙিন পোশাক ও অলংকার ব্যবহারের প্রচলন আছে।
বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে বাংলাদেশে খুমি জনগোষ্ঠী সংখ্যা ৩ হাজারের মত ধারণা করা হয়। পার্শ্ববর্তী ভারতের মিজোরাম রাজ্যেও সমসংখ্যক খুমি জনগোষ্ঠীর বসবাস। তবে এর বৃহৎ অংশ এখন মায়ানমারে বসবাস করে – যার সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ।
বাংলাদেশে এদের সংখ্যা অল্প হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান তাদের মূলধারার সঙ্গে সংযোগকে কঠিন করে তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে কিছু অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
খুমি জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা জাতীয় দায়িত্বের অংশ।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের আদিবাসী সমাজ | খিয়াং (Khyang) জনগোষ্ঠী







Leave a Reply