ভূমিকা
ইব্রাহিমীয় ধর্মের শাখা ইহুদিবাদের ইতিহাসে “জিলট (Zealots)” একটি গুরুত্বপূর্ণ তবে বিতর্কিত আন্দোলন। এটি ধর্মীয় মতবাদ না হলেও, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উন্মাদনার এক মিশ্র রূপ, যা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে রোমান শাসনের বিরুদ্ধে ইহুদিদের এক বিপ্লবী ধারা হিসেবে গড়ে ওঠে। তাদের লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলকে পুনরায় স্বাধীন করা এবং “ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারো আধিপত্য” মান্য না করা।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে যখন জেরুজালেম এবং সমগ্র জুদেয়া শাসিত হচ্ছিল, তখন ইহুদিদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়। কেউ রোমের কর্তৃত্ব মেনে নেয়, কেউ আবার তাকে ধর্মবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করে।
এই দ্বিতীয় দলের মধ্য থেকেই জিলট আন্দোলনের জন্ম। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টাব্দ ৬ সালে গালিলির জুডাস অব গালিলি (Judas of Galilee) এই আন্দোলনের সূচনা করেন।
মতবাদ ও বিশ্বাস
জিলটরা বিশ্বাস করত—
- ঈশ্বরই একমাত্র রাজা এবং কোনো মানবশাসক বা বিদেশী কর্তৃত্ব মান্য করা পাপ।
- তারা মনে করত, রোমান কর প্রদান বা তাদের আইনের অধীন হওয়া মানেই ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
- সহিংসতা ও শহিদি চেতনা ছিল তাদের আদর্শ— তারা বিশ্বাস করত, ঈশ্বরের জন্য প্রাণ দেওয়া মহিমান্বিত কাজ।
- তাদের মূলমন্ত্র ছিল: “No Lord but God” – ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোনো প্রভু নয়।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রভাব
জিলটরা ধর্মীয় উন্মাদনা এবং দেশপ্রেমকে একত্র করে রোমান শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠিত করেছিল।
- তারা গোপন সংগঠন সিকারি (Sicarii) গঠন করে, যারা রোমান সৈন্য ও সহযোগী ইহুদিদের গুপ্তহত্যা করত।
- তাদের সবচেয়ে বড় আন্দোলন ছিল খ্রিষ্টাব্দ ৬৬–৭৩ সালের “জিউইশ রিভোল্ট”।
- এই বিদ্রোহের পরিণতিতে ৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমানরা জেরুজালেম ও মন্দির ধ্বংস করে দেয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন
যদিও জিলটরা নিজেদের ঈশ্বরের যোদ্ধা মনে করত, পরবর্তীকালে ইহুদি ধর্মতত্ত্বে তাদের চরমপন্থা সমালোচিত হয়।
- শান্তিবাদী ইহুদি গোষ্ঠীগুলি যেমন ফ্যারিসি ও এসেনি, জিলটদের সহিংসতা ও অন্ধ জাতীয়তাবাদকে বিপজ্জনক মনে করেছিল।
- তবে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, জিলটদের এই ত্যাগ ও প্রতিরোধই ইহুদিদের জাতীয় আত্মপরিচয় রক্ষা করেছিল।
উপসংহার
জিলটরা ছিল একদিকে ধর্মীয় উন্মাদনায় ভরপুর জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী, অন্যদিকে স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদানকারী বিপ্লবী দল।
তাদের ইতিহাস ইহুদিবাদের রাজনৈতিক দিক ও ধর্মীয় উগ্রতার এক জীবন্ত উদাহরণ।
আজও “Zealot” শব্দটি ব্যবহার হয় অতি উৎসাহী বা উগ্র ধর্মীয় অনুগামী বোঝাতে— যা ইঙ্গিত দেয়, বিশ্বাসের অতিরিক্ত উন্মাদনা কখনও কখনও জাতির সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।








Leave a Reply