পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি কল্পনা করলে একটি দৃশ্য সামনে আসে—পারমাণবিক যুদ্ধ। শহর ধ্বংস হচ্ছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, সরকার অচল হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু দেশ এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে যাতে রাষ্ট্র পরিচালনা থেমে না যায়।
এই কারণেই তৈরি হয়েছে এক বিশেষ ধরনের বিমান—ডুমসডে প্লেন (Doomsday plane)।
সবচেয়ে পরিচিত এই বিমান হলো Boeing E-4B Nightwatch—যাকে অনেক সময় বলা হয় “Flying Pentagon” বা “আকাশে ভাসমান সামরিক সদর দপ্তর”।
ডুমসডে বিমান নির্মাণের ধারণা তৈরি হয়Cold War-এর সময়। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা এতটাই তীব্র ছিল যে একটি প্রশ্ন উঠে আসে—যদি রাজধানী ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে কে যুদ্ধ পরিচালনা করবে?
এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবেই তৈরি করা হয় আকাশে ভাসমান কমান্ড সেন্টার—ডুমসডে প্লেন।
ডুমসডে প্লেন কোনো সাধারণ সামরিক বিমান নয়। এটি এমন একটি উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার যেখানে বসে—(১) রাষ্ট্রপতি (২) সামরিক কমান্ডার ও (৩) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়- বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারেন।
এই বিমান পরিচালনা করে যুক্তিরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী এবং এটি তৈরি করেছে Boeing কোম্পানি।
অর্থাৎ পৃথিবীর মাটিতে প্রযুক্তি নষ্ট হয়ে গেলেও আকাশে এই বিমান চালু থাকতে পারে।
আকাশে থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা। এই বিমানে রয়েছে বিশাল যোগাযোগ ব্যবস্থা—স্যাটেলাইট যোগাযোগ, সামরিক ঘাঁটির সঙ্গে সরাসরি লিংক ও পারমাণবিক সাবমেরিনের সঙ্গে যোগাযোগ।
অর্থাৎ পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় থাকা সামরিক বাহিনীকে এখান থেকে নির্দেশ দেওয়া সম্ভব।
আকাশে কয়েক দিন উড়ে থাকতে পারে। এই বিমানের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো এর দীর্ঘ সময় আকাশে থাকার সক্ষমতা।একটানা ১২ ঘণ্টার বেশি উড়তে পারে। উড়ন্ত অবস্থায়ই জ্বালানি নিতে পারে। মাঝ আকাশে জ্বালানি নিলে কয়েক দিন আকাশে উড়ে থাকতে পারে।
তাই মাটিতে যদি সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়, তবুও এই বিমান আকাশে থেকে কমান্ড চালিয়ে যেতে পারে।
ডুমসডে প্লেনের গোপন ক্ষমতাঃ পারমাণবিক বিস্ফোরণেও কাজ করবে ডুমসডে বিমান। পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় একটি ভয়ংকর ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস (EMP) তৈরি হয়, যা সাধারণ ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ধ্বংস করে দিতে পারে। কিন্তু E-4B বিমান এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে- EMP এর প্রভাব কম পড়ে, ইলেকট্রনিক সিস্টেম সুরক্ষিত থাকে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু থাকে।
একটি উড়ন্ত অফিস কমপ্লেক্স স্থাপন করা আছে এই বিমানে। বিমানের ভেতরটা প্রায় একটি ছোট প্রশাসনিক ভবনের মতো।ভিতরে রয়েছে—(১) যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ(২) কনফারেন্স রুম(৩) যোগাযোগ কেন্দ্র(৪) বিশ্রাম কক্ষ(৫) অপারেশন অফিস
একসঙ্গে প্রায় ১০০–১১০ জন কর্মকর্তা এতে কাজ করতে পারেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪টি E-4B Nightwatch ডুমসডে বিমান রয়েছে। এগুলো সাধারণত রাখা হয়—Offutt Air Force Base-এ । অন্তত একটি বিমান সবসময় প্রস্তুত রাখা হয়।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার আক্রমণ যা ৯/১১ হামলা নামে পরিচিত- সেই আক্রমণের সময় এই ডুমসডে প্লেনগুলোকে জরুরি প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছিল। কারণ তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিশ্বের বড় সামরিক শক্তিগুলোর কাছেও অনুরূপ বিমান রয়েছে। যেমন রাশিয়ার রয়েছে—Ilyushin Il-80
এটিও মূলত পারমাণবিক যুদ্ধের সময় ব্যবহারের জন্য তৈরি।
ডুমসডে প্লেন আসলে মানুষের প্রযুক্তিগত ভয় ও নিরাপত্তা চিন্তার এক অদ্ভুত প্রতিফলন।
পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি—পারমাণবিক যুদ্ধ—ঘটলেও যেন রাষ্ট্র ও সামরিক কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে, সেই প্রস্তুতির অংশ এই বিমান।
অর্থাৎ পৃথিবী ধ্বংসের মুখে গেলেও আকাশে ভেসে থাকা একটি বিমান থেকে তখনও চলতে পারে যুদ্ধের নির্দেশ।
আরও পড়ুনঃ রাডারের একটি ভুল রিপোর্টে পারমাণবিক যুদ্ধ প্রায় শুরু হয়ে যাচ্ছিলো







Leave a Reply