১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল অস্বাভাবিক। বড় একটি ঐতিহ্যবাহী দল নির্বাচনে অনুপস্থিত। ভোটের প্রতিযোগিতা ছিল সীমিত। জনআস্থা প্রশ্নবিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে “তিন উপদেষ্টা ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন” শিরোনামটি নিছক সংবাদ নয়—এটি রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র নিয়ে এক গভীর রাজনৈতিক সংকেত।
নির্বাচনের বৈধতা বনাম প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
যখন একটি বড় দল নির্বাচনে নেই, তখন নির্বাচনের ফলাফল আইনগতভাবে বৈধ হলেও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দুর্বলতার ফাঁকেই প্রশাসনিক শক্তি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন হলো—উপদেষ্টারা কি এই রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন?
বাংলাদেশ ২০০৭-০৮ সালে দেখেছে, কীভাবে একটি অস্থায়ী কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করতে পারে। Fakhruddin Ahmed-এর নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুরুতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও, পরে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকেই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে—এমন অভিযোগ আজও বিতর্কে আছে।
অন্তর্বর্তী শক্তি যখন মনে করে রাজনীতি “অপরিণত”, তখন তারা নিজেদের “অভিভাবক” ভাবতে শুরু করে। এখানেই গণতন্ত্র বিপদে পড়ে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: অংশগ্রহণ না প্রতিযোগিতা?
একটি নির্বাচনের মূল শক্তি প্রতিযোগিতা। কিন্তু যখন বড় রাজনৈতিক শক্তি অনুপস্থিত, তখন ভোট হয়—কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না। এই বাস্তবতায় জনগণের ম্যান্ডেট আংশিক হয়ে যায়।
এই আংশিক ম্যান্ডেটের উপর দাঁড়িয়ে যদি প্রশাসনিক বা উপদেষ্টা গোষ্ঠী নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চান, তবে সেটি গণতন্ত্রের বিকল্প কাঠামো তৈরির ইঙ্গিত দেয়।
এটি সরাসরি “ক্ষমতা দখল” না হলেও, “ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা”—যা অনেক সময় আরও সূক্ষ্ম এবং দীর্ঘস্থায়ী।
জন আস্থা সংকট ও নৈতিক উচ্চভূমি
যখন জনগণের একাংশ রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা হারায়, তখন একটি ধারণা তৈরি হয়—“দলীয় রাজনীতি ব্যর্থ; নিরপেক্ষ লোকেরা থাকাই ভালো।”
এই যুক্তি বিপজ্জনক। কারণ গণতন্ত্রে ব্যর্থতার সমাধান নির্বাচন, বিকল্প নেতৃত্ব ও জনমত—অভিভাবকতন্ত্র নয়।
পাকিস্তানে জেনারেল-সমর্থিত শাসন শুরু হয়েছিল ঠিক এই যুক্তিতে—রাজনীতি দুর্নীতিগ্রস্ত, তাই শক্ত হাত দরকার। ফলাফল কী হয়েছিল, তা আমরা Pervez Musharraf-এর সময় দেখেছি—অস্থায়ী সংকট-ব্যবস্থাপনা স্থায়ী ক্ষমতায় রূপ নেয়।
বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটবে?
ক্ষমতা ধরে রাখার বাস্তব কারণ
কেন উপদেষ্টারা ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইতে পারেন?
- প্রশাসনিক নিয়োগ ও সিদ্ধান্তে প্রভাব বজায় রাখা
- ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করা
- নির্বাচন-পরবর্তী জবাবদিহি এড়ানো
- আন্তর্জাতিক মহলে “স্থিতিশীলতার মুখ” হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা
এগুলো সরাসরি প্রমাণের বিষয় না হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে অস্বীকার করা যায় না।
মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্র চিন্তা বনাম প্রশাসনিক রাষ্ট্র
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল জনগণের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধিকার রক্ষার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের দর্শন ছিল—রাষ্ট্রের মালিক জনগণ।
যদি কোনো উপদেষ্টা গোষ্ঠী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর ছায়া-নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়, তবে সেটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অন্তর্বর্তী কাঠামো সেতু হতে পারে—কিন্তু গন্তব্য হতে পারে না।
শেষ কথা
“তিন উপদেষ্টা ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন”—এই অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, এটি একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে:
বাংলাদেশে নির্বাচনী বৈধতা, জনআস্থা এবং প্রশাসনিক শক্তির ভারসাম্য এখন গভীরভাবে প্রশ্নের মুখে।
গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
আর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—অস্থায়ী শক্তির স্থায়ী হয়ে ওঠা।







Leave a Reply