গরীবের ভ্রমণ বিলাস (পর্ব-৩৬): রাজধানী এক্ষপ্রেস ট্রেনে কলকাতা থেকে দিল্লি ভ্রমণ

 

ছবিঃ গুগল থেকে

 

‘২০১৬ সালে
কলকাতা মারকুইস স্ট্রিট থেকে হাওড়া রেল ষ্টেশনের ট্যাক্সি ভাড়া ছিলো মাত্র ১২০ রুপি।
এখনও তা খুব একটা বাড়েনি। গত ফেব্রুয়ারি ২০২৫ মাসেও মারকুইস ষ্টেশন থেকে শিয়ালদহ
রেল ষ্টেশনে এলাম মাত্র ১২০ রুপি ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে, যা ২০১৬ সালেও একই ছিল্‌ বরং
যতোদূর মনে পড়ে চারজনে ১৪০ বা ১৫০ রুপি লেগেছিলো।’

 

রাজধানী
এক্সপ্রেস যথাসময়ে হাওড়া ছেড়ে দিল্লির পথে ছুটলো। ভারতীয় রেলের সেবার মান অনেক ভালো
তা আগে থেকেই জানতাম। তবে ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’ এর মতো ট্রেনের যাত্রীসেবার মান
যে এতো ভালো, এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা, ভিন্ন অনুভূতি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কামরা,
প্রতিনিয়ত খাবার পরিবেশন—চা-নাস্তা , রাতের খাবার, সকালের নাস্তা—সব মিলিয়ে
ভ্রমণের ক্লান্তি যেন অর্ধেক হয়ে গেল। 
ট্রেনে কোনো হকার নেই।  পিকনিকের মতো মনে হলো। 

 

পূর্ববর্তী পর্বঃ গরীবের ভ্রমণ বিলাস (পর্ব-৩৩): ২০১৬ সালে ভারতের কয়েটি দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন

 

আমাদের
সিটগুলো ছিল স্লিপার সিট। দুইটা নিচে, দুইটা উপরে। ইচ্ছে করলেই যারযার সিটে শুয়ে
যেতে পারতাম। কিন্তু জার্নির যে একটা অদৃশ্য অনুভূতি আছে সেটা প্রায় অবদমনীয়। সবাই
নিচে বসে ১১০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা ট্রেনের গতি অনুধাবন কর্তে লাগলো আর বাইরের
দৃশ্য দেখার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু দ্রুতগামী ট্রেন চলার সময় শুধু স্থান বা
প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলি দ্রুতগতিতে পেছনের দিকে যাচ্ছে, শুধু এটাই অনুভব করা যায়;
ট্রেন যাচ্ছে বলে মনে হয় না, কিছু দেখাও যায় না। কোনো ষ্টেশনে থামলে শুধু ষ্টেশনের
কলরব আর যাত্রী ওঠা-নামা দেখা যায়।

 

আগেও নয়,
পরেও নয়, ১৭ ঘন্টার জার্নি শেষে নির্ধারিত সময়েই পরের দিন সকাল ১০টার পরপর দিল্লি
মেইন স্টেশনে পৌঁছলাম। প্রথমেই চোখে পড়ল—এ শহরের ব্যস্ততা আর চাপা অস্থিরতা।
কলকাতার কোলাহল থাকলেও দিল্লির ভিড় যেন আরও ঘন, আরও ছুটোছুটি।

স্টেশন
থেকে বের হয়েই আগে হোটেল খোঁজার পালা।

 

দিল্লি
শহরে একটা জিনিস খুব প্রকট, তা হলো দালাল। শুধু দিল্লি নয়, আজমির এবং আগ্রাতেও একই
অবস্থা, দালালে ভরপুর- যেটা কলকাতা নেই। দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজারে
গিয়ে মনে হয়েছে আরেক ঢাকা। ধোকাবাজ দালাল তথা সাহায্য করার আশ্বাস দিয়ে প্রতারণা
করা বাংলাভাষী প্রতারকদের বেশিরভাগই ঢাকার। অন্যদিকে আজমিরে বেশিরভাগ দালাল নাম্মী
প্রতারক পাকিস্তানি বলে মনে হয়েছে।

 

আরও পড়ুনঃ  গরীবের ভ্রমণ বিলাস (পর্ব-৩৪): আগরতলার মানিক্য রাজ বংশের রাজ প্রাসাদ পরিদর্শন

 

তো হোটেল
খুজতে নেমে দালালের যন্ত্রণায় অতীষ্ঠ, পিছু ছাড়ে না। অবশেষে একজন সৎ দালাল পেলাম। বেচারার
কথা শুনে প্রতারক মনে হয়নি, তাই পিছু নিলাম। সাথে গিয়ে দেখি মেইন রোডে হোটেল ভাড়া
যা (টাকার অংক সঠিক মনে নেই, তবে ১৬০০-১৮০০ রুপী হবে), গলি দিয়ে ৫০ গজ ভেতরে গেলে
একই মানের হোটেলের ভাড়া তার অর্ধেক। কারণটা হলো, অচেনা লোকের দৃষ্টির আড়ালে থেকে
যায় সেসব হোটেল। দালালের কাছে এই সাহায্যটুকু পেয়েছিলাম। তার মানে, পেশায় দালাল
হলেও দুয়েকজন ভালো লোকও তারমধ্যে আছে। যে ডেকে নিয়ে গ্যেছিলো সে বললো, তার বেনিফিট-
রুমপ্রতি প্রতিদিন ৫০ রুপি কমিশন। এটা মক্কা নগরীতেও দেখেছি। বোর্ডার জোগার করতে
পারলে, রুমপ্রতি কমিশন প্রতিদিন ১০।

 

শরীরে
তখনও জার্নির ধকল, তাই সেদিন হালকা ঘোরাঘুরি আর বিশ্রামেই কাটলো। পরেরদিন ট্যাক্সি
নিয়ে বেরুলাম দিল্লির কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য স্থান দেখার উদ্দেশ্যে। দিল্লি গেট,
নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার, কুতুব মিনার ইত্যাদি দেখে হোটেলে ফিরলাম। নিজামুদ্দিন
আউলিয়ার মাজার প্রতারকে ভরপুর তা আগেই বলেছি। এখনও ভাবি- এই উপমহাদেশের মানুষ প্রতারণার
জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে হাতিয়ার বা পুঁজি হিসাবে।

 

‘দিল্লিতে
রাস্তায় চলাচলের সময় যে বিষয়গুলো লক্ষ্য করেছি; ট্যাক্সিতে উঠলেই ড্রাইভার সাথে
সাথে বলবে, “বেল্ট লাগাইয়ে, আঙ্কেল”। এভাবে যতো জায়গায় নেমেছি এবং উঠেছি, একই
সাবধান বাণী। একসময় ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের দেশে ড্রাইভার বেল্ট না
লাগালে ধরে, তাও সব সময় না, আর তুমি সেকেন্ড সিটের যাত্রীর বেল্ট বাঁধতে বলছো সব
সময়- কারণ কি? উত্তর দিলো, সেকেন্ড সিটের প্যাসেঞ্জার বেল্ট না লাগালে তাকে ৬০০ রুপি
জরিমানা করবে ট্রাফিক পুলিশ।‘

 

‘আরেকদিনের
ঘটনা। রাস্তা পার হচ্ছি, এরমধ্যে হঠাৎ সবুজ বাতি জ্বলে গেলোস। আমরা পড়লাম রাস্তার
মাঝে। আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম। ড্রাইভাররা ইশারা দিয়ে যেতে বললো। যতোক্ষণ রাস্তা পাড়
না হলাম, ততোক্ষণ আমাদের বরাবর যেসব গাড়ি ছিলো তারা আমাদের রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ
দিলো। আমাদের দেশে ওসবের কেউ তোয়াক্কা করে না।‘

 

পরেরদিন
দিল্লির লাল কেল্লা ও দিল্লি জামে মসজিদ দেখার প্রোগ্রাম মাথায় নিয়ে সেদিনের মতো
ঘোরাঘুরি শেষ করে বিশ্রামের চিন্তা করলাম।

 

দিল্লিতে
সাধারণ রেস্টুরেন্টগুলোর খাওয়া-দাওয়ার মান ততোটা ভালো মনে হয়নি, বিশেষকরে আমরা যে
এলাকায় ছিলাম তার আশেপাশে। আমরা দিল্লি মেইন রেল ষ্টেশনের কাছে কাছেই ছিলাম। (চলবে…)

(২০১৬ সালের ঘটনা)

 

আরও পড়ুনঃ  গরীবের ভ্রমণ বিলাস (পর্ব-৩৫): এ ট্রেন জার্নি বাই “চন্দনা এক্সপ্রেস”

 পরবর্তী পর্বঃ  গরীবের ভ্রমণ বিলাস (পর্ব-৩৭)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top