শেখ মুজিবুর রহমান-কে বিচার করতে হলে আগে তার সময়টাকে বুঝতে হবে। আজকের ২০২৬ সালের বাস্তবতা দিয়ে ১৯৭২–৭৫ সালের বাংলাদেশকে মাপতে গেলে ভুল হবেই। কারণ স্বাধীনতার পরের বাংলাদেশ ছিল একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্র। অর্থনীতি ধ্বংস, প্রশাসন অকার্যকর, যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, দুর্ভিক্ষ, চোরাচালান, যুদ্ধে হেরে যাওয়া বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি ও প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের চক্রান্তে গঠিত এদেশীয় প্রতিবিপ্লবী দ্বারা রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এক চরম সংকটকাল তখন।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ১৯৭৫ সালে গঠিত হয় “বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ” বা বাকশাল (BAKSAL)। বাকশাল কথাটা শুনতে কেমন নকশাল নকশাল মনে হয় তাই না? কিন্তু আসলে তা না।
বাকশাল কি একদলীয় শাসন ছিল—নাকি রাষ্ট্র বাঁচানোর চেষ্টা?
বাকশালকে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়, তা হলো “একদলীয় শাসন”। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটা কি সত্যিই শুধুই ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ ছিল, নাকি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার কৌশল ছিল?
১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। বিরোধী দল কার্যত ছিল দুর্বল, বিভক্ত এবং অনেকাংশে সংসদবিমুখ।
বিজয় অর্জনের লগ্নেই পূর্বে উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে “জাতিয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)” সহ আরো কিছু “আন্ডারগ্রাউন্ড” পার্টি, যা ছিল মূলত প্রধান বিরোধী শক্তি। কিন্তু তাদের রাজনীতি ছিল বিপ্লবমুখী, সংসদীয় ধারার বাইরে।
সিরাজুল আলম খান-এর মতো নেতারা সরাসরি নির্বাচনে না এসে নেপথ্যে রাজনীতি করতেন।
পুরনো যেসব অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল ছিলো, যেমন ন্যাপ (ভাষানী), ন্যাপ (মোজাফফর)- তারা সরাসরি বিরোধিতায় তখন নামেনি। মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ইত্যাদি দলগুলো তখন দৃশ্যের বাইরে, কার্যত নিস্ক্রীয়। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জামাতে ইসলামী ছিলো নিষিদ্ধ। ইতিহাসের পরিক্রমায় তারাই পরবর্তীতে মূল চক্রান্তকারীরুপে আবির্ভূত হয়, যা এখনও সক্রিয়।
এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সামনে প্রশ্ন ছিল—
রাষ্ট্র চালাবেন কীভাবে? দুর্বল বিরোধী রাজনীতির মধ্যে অস্থিরতা টিকিয়ে রেখে, নাকি একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামো তৈরি করে?
বাকশাল ছিল সেই দ্বিতীয় পথের নির্বাচন।
বাকশাল: একক দল, নাকি বহুদলের সমন্বিত কাঠামো?
অনেকে বলেন, বাকশাল মানেই একদলীয় শাসন। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। বাকশাল গঠনের উদ্দেশ্য ছিলো সবাইকে এক প্লাটফরমে নিয়ে আসা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মত একই আসনে একাধিক ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। যিনি ভোট বেশি পাবেন তিনিই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন।
বাকশাল গঠনের সময় শুধু আওয়ামী লীগ নয়—ন্যাপ, সিপিবি, আতাউর রহমান খানের জাতীয় লীগ, সবাই নিজেদের দল বিলুপ্ত করে এতে যোগ দেন।
এমনকি প্রবীন রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ এবং প্রথিতযশা সাংবাদিক প্রয়াত আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা ও স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, তৎকালিন উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাকশালের সদস্যপদ প্রাপ্তির জন্য বঙ্গন্ধুরর কাছে সুপারিশ করতে তাদেরকে অনুরোধ করেন। যা প্রমাণ করে, বিষয়টি এতটা একরৈখিক ছিল না, যতটা পরে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ, এটি “একদলীয় আধিপত্য” ছিল না, বরং “এক প্ল্যাটফর্মে সব রাজনৈতিক শক্তির একীভবন”—যদিও সেটি ছিল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন।
এখানে একটা কথা স্মরণ করা আবশ্যক। ১৪ আগষ্ট ১৯৭৫ তারিখে বাকশাল ঘোষিত হয় এবং বাংলাদেশের তৎকালিন ৬০ টি মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করে প্রতি জেলায় একজন করে জেলা গভর্নরের (বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের আদলে) নাম ঘোষণা করা হয়। তখন নাটোর জেলা গভর্ণরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে জিয়াউর রহমান সাহেব একটি শুভেচ্ছা পত্র পাঠান, যা পরবর্তীতে পত্রিকান্তরে প্রকাশ পায়।
সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ: স্বৈরাচার নাকি সংকট ব্যবস্থাপনা?
১৯৭৫ সালের ১৬ জুন চারটি পত্রিকা রেখে বাকিগুলো বন্ধ করা হয়। আজকের গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে এটি অবশ্যই কঠোর ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।
কিন্তু তখনকার বাস্তবতা ছিল- যুদ্ধোত্তর গুজব ও বিভ্রান্তি, বিদেশি প্রভাব ও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা। এসব নিয়ন্ত্রণে একটু কঠোর হতে হয়েছিল বৈকি।
বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন—শিক্ষিত সমাজের একটি অংশ দুর্নীতির সাথে জড়িত এবং তারাই বেশি লেখালেখি ও মতামত তৈরি করছে।
তাই তিনি এটিকে ঘোষণা করেছিলেন “দ্বিতীয় বিপ্লব”—একটি “শোষিতের গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে।
বৈশ্বিক বাস্তবতা: বাংলাদেশ কি ব্যতিক্রম ছিল?
যারা বাকশালকে একমাত্র “স্বৈরাচার” হিসেবে তুলে ধরেন, তারা প্রায়ই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এড়িয়ে যান।
(১) ভ্লাদিমির লেনিন – একদলীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র
(২) মাও সেতুং – কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক কাঠামো
(৩) হো চি মিন – দীর্ঘমেয়াদি একক নেতৃত্ব
(৪) মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক – রাষ্ট্র গঠনে কঠোর ক্ষমতা প্রয়োগ
এই নেতাদের ক্ষেত্রে “রাষ্ট্র গঠন” বলা হয়, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে শুধু “স্বৈরাচার”—এই দ্বৈত মানদণ্ড প্রশ্ন তোলে।
সমালোচনার জায়গা—এগুলো অস্বীকার করা যাবে না
একটি সৎ বিশ্লেষণ কখনো একপেশে হয় না। বাকশালের সমালোচনার জায়গাগুলোও বাস্তব—
(১) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করা
(২) রাজনৈতিক বহুমতের সংকোচন
(৩) ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ
এই সিদ্ধান্তগুলো নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক আদর্শের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
কিন্তু একইসাথে এটাও সত্য—সাময়িকভাবে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টায়।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাকশালের নীতি ছিলো- ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, ৬০ বিঘার বেশি জমি একক মালিকানাধীন থাকবে না, গ্রামে গ্রামে সমবায়ের ভিত্তিতে চাষাবাদ হবে, জমির মালিক তার বর্গাংশ পাবে, অবশিষ্টাংশ প্রান্তিক কৃষক বা যারা শ্রম দেবে তাদের মধ্যে ভাগ হবে – ইত্যাদি।
১৯৭৫: শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, একটি ধারার সমাপ্তি
শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা শুধু একজন নেতার মৃত্যু ছিল না—এটি ছিল একটি রাজনৈতিক পথের আকস্মিক ও সহিংস সমাপ্তি।
প্রশ্ন এখানেই—
যদি বাকশালই মূল সমস্যা হতো, তাহলে কি একটি পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে হতো?
এই প্রশ্ন থেকেই অনেকে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের দিকে ইঙ্গিত করেন।
উপসংহার: না জেনে চিৎকার—সবচেয়ে বড় সমস্যা
বাকশালকে আপনি সমর্থন করতে পারেন, সমালোচনা করতে পারেন—দুটোই বৈধ।
কিন্তু না পড়ে, না বুঝে, শুধু রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে বিচার করা, বাকশালে “নকশাল”এর ছায়া দেখা – এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
স্বাধীনতার পর নকশাল, সর্বহারা পার্টি নামে কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির আবির্ভাব ঘটে—যারা মূলত ধনী-গরীবের মাঝে বৈষম্য দূর করার নামে, ধনীদের মাল কেড়ে নিয়ে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার নামে ধনীদের বাড়িতে ডাকাতি, লুটপাট করতো এবং সেসব মালামাল নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতো, যা সম্পূর্ণ বেআইনী। এতে গরীবদের কোনো লাভ তো হতোই না, বরং সমাজে একটি আতংক বিরাজ করতো।
বাকশাল ছিল—
একদিকে যেমন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক সাহসী চেষ্টা, অন্যদিকে বিতর্কিত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ।
সত্য মাঝখানেই থাকে।
আর ইতিহাসকে বুঝতে হলে—চিৎকার নয়, প্রয়োজন পড়াশোনা, জানা।
আরও পড়ুনঃ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দ্বন্দ্ব কেন: ইতিহাস, রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ পথ







Leave a Reply