ভারতীয় গজলের ইতিহাসে জগজিৎ সিং একটি কিংবদন্তির নাম। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া ‘হোঁঠোঁ সে ছুঁ লো তুম’, ‘তুম ইতনা যো মুসকুরা রহে হো’, ‘চিঠি না কোই সংবাদ’ কিংবা ‘ঝুঁকি ঝুঁকি সি নজর’ আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে একইরকমভাবে বেঁচে আছে। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল একজন গজল শিল্পী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। আলো-ঝলমলে মঞ্চের আড়ালে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ মানবিক মানুষ—যিনি নিঃশব্দে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কারও চিকিৎসার খরচ দিয়েছেন, কারও মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন, কারও পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন, আবার বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে গান গেয়েছেন।
জগজিৎ সিংয়ের মানবিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কখনো তা প্রচার করতে চাইতেন না। অনেকেই দান করেন, কিন্তু সে কথা সবাইকে জানাতেও ভালোবাসেন। জগজিৎ সিং ছিলেন সম্পূর্ণ উল্টো। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্যিকারের সাহায্য সেই, যা নিঃশব্দে করা হয়। তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা পরে বলেছেন, তিনি প্রায়ই নিজের সঙ্গে টাকা নিয়ে বের হতেন, একটি তালিকা থাকত—কাকে কত টাকা দিতে হবে। কারও দরকার ২৫ হাজার, কারও ৫০ হাজার, কারও বা কয়েক লাখ। তিনি নিজে গিয়ে সেই টাকা পৌঁছে দিতেন। অনেক সময় যাদের সাহায্য করেছেন, তারা শেষ পর্যন্ত জানতেও পারেননি কে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
একবার তাঁর স্টুডিওর এক কর্মচারী মেয়ের বিয়ের জন্য অর্থসংকটে পড়ে তাঁর কাছে সাহায্য চান। অন্য কেউ হলে হয়তো একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন, তহবিল সংগ্রহ করতেন, সংবাদমাধ্যম ডাকতেন। কিন্তু জগজিৎ সিং চুপচাপ প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়ে দেন।
আরেকবার তাঁর ড্রাইভারের পরিচিত এক ব্যক্তি বিপদে পড়লে তিনি তাকে একটি মিষ্টির বাক্স দেন। পরে দেখা যায়, বাক্সের ভেতরে রয়েছে দুই লাখ রুপি। তিনি কখনো চাননি, মানুষ তাঁর দানের কথা জানুক; তিনি শুধু চাইতেন, মানুষের কষ্ট দূর হোক।
জগজিৎ সিং বহু বছর ধরে অসংখ্য দাতব্য কনসার্ট করেছেন। বিভিন্ন এনজিও, হাসপাতাল, ক্যানসার ফাউন্ডেশন, শিশুদের শিক্ষা প্রকল্প, কুষ্ঠরোগীদের পুনর্বাসন কর্মসূচি—এসবের জন্য তিনি বিনা পারিশ্রমিকে গান গেয়েছেন। কোনো কোনো কনসার্টে টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ তিনি দান করে দিতেন। তিনি ক্যানসার রোগীদের সহায়তার জন্য কাজ করা সংস্থাগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন, কুষ্ঠরোগীদের জন্য কাজ করা সংগঠনের জন্য গেয়েছেন, পথশিশুদের শিক্ষা ও আশ্রয়ের জন্য তহবিল গড়েছেন। তাঁর কাছে গান কেবল বিনোদন ছিল না; গান ছিল মানুষের জন্য কিছু করার একটি মাধ্যম।
বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো একটি দিক হলো—জগজিৎ সিং কেবল ভারতের মানুষের জন্যই কাজ করেননি। তিনি দেশ-ধর্ম-সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পাকিস্তানের কিংবদন্তি গজল শিল্পী মেহেদী হাসান যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, তখন জগজিৎ সিং তাঁর জন্য কনসার্ট করে অর্থ সংগ্রহ করেন। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই তিক্ত থাকুক, একজন শিল্পী আরেকজন শিল্পীর জন্য, একজন মানুষ আরেকজন মানুষের জন্য কীভাবে দাঁড়াতে পারে—জগজিৎ সিং তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর একমাত্র ছেলে বিবেক সিংয়ের মৃত্যু। এই শোক তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল। দীর্ঘ সময় তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই গভীর ব্যক্তিগত বেদনা তাঁকে কঠোর বা আত্মকেন্দ্রিক করেনি; বরং তিনি আরও বেশি মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখেছিলেন। যারা সন্তান হারিয়েছেন, যারা জীবনের কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি আরও বেড়ে যায়। তাঁর পরবর্তী অনেক গানেও এই বেদনা, মানবতা ও জীবনের গভীর উপলব্ধি ফুটে উঠেছে।
জগজিৎ সিংয়ের মানবিকতার আরেকটি দিক ছিল তাঁর আচরণে। তিনি বড় শিল্পী হয়েও কখনো অহংকারী ছিলেন না। নতুন শিল্পীদের উৎসাহ দিতেন, স্টেজের কর্মীদের সম্মান করতেন, ছোট মানুষদের সঙ্গে খুব সহজভাবে মিশতেন। অনেক নতুন গায়ক-গায়িকা পরে বলেছেন, জগজিৎ সিং তাদের কেবল গান শেখাননি, মানুষ হওয়াও শিখিয়েছেন। তিনি বলতেন, শিল্পী হওয়া সহজ, কিন্তু ভালো মানুষ হওয়া অনেক কঠিন।
আজকের সময়ে আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো তারকা কিছু দান করলে তা সঙ্গে সঙ্গে ছবি, ভিডিও, সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে জগজিৎ সিং ছিলেন এক অন্যরকম মানুষ। তিনি ক্যামেরার সামনে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়াতে পছন্দ করতেন। তিনি হয়তো জানতেন, গজলের করুণ সুর একদিন থেমে যাবে, কিন্তু মানুষের জন্য করা ভালোবাসা ও সাহায্য কখনো মুছে যাবে না।
তাই জগজিৎ সিংকে শুধু গজলের সম্রাট বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তিনি ছিলেন মানবতারও এক সম্রাট—যার সুর মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে, আর যার নীরব দান অসংখ্য মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। তাঁর কণ্ঠ হয়তো আজ থেমে গেছে, কিন্তু তাঁর মানবিকতা এখনও বেঁচে আছে—প্রতিটি ভালো কাজের মধ্যে, প্রতিটি নিঃস্বার্থ সাহায্যের মধ্যে, প্রতিটি মানুষের মুখে, যে আজও মনে করে—জগজিৎ সিং শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মনের মানুষ। এমন একটি স্মৃতিচারণ কন্ঠশিল্পী কুমার শানুর মুখেও শোনা গেছে।
আরও পড়ুনঃ







Leave a Reply