জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ সংবিধান ও আইনের শাসনের মুখোমুখি এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত
সাম্প্রতিক সময়ে জারি করা “জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ” বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর একাধিক স্তম্ভের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি সংবিধানের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতার সীমা—সবকিছুকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এই লেখায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯, ২৭, ৩১, ৩৫ এবং ৯৩–এর আলোকে অধ্যাদেশটির সাংবিধানিক বৈধতা বিশ্লেষণ করা হলো।
জাতির ঐক্য ও সাংবিধানিক দর্শনের প্রশ্ন (অনুচ্ছেদ ৯)
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯ রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেয় জনগণের ঐক্য ও সংহতি সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করতে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। যদিও এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির অংশ এবং সরাসরি বিচারযোগ্য নয়, তবে এটি সংবিধান ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আলাদা পরিচয় ও বিশেষ আইনি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নাগরিকদের মধ্যে আইনি মর্যাদার ভিন্নতা তৈরি হয় এবং জাতি কার্যত “বিশেষ সুবিধাভোগী” ও “সাধারণ নাগরিক”—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত হয়। এটি জাতীয় ঐক্য ও অভিন্ন নাগরিকত্বের ধারণার পরিপন্থী এবং সংবিধানের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইনের দৃষ্টিতে সমতা লঙ্ঘন (অনুচ্ছেদ ২৭)
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ ঘোষণা করে—আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
দায়মুক্তি অধ্যাদেশ এই নীতিকে সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। একই ধরনের অপরাধে একজন সাধারণ নাগরিক বিচারাধীন হবেন, অথচ “জুলাই যোদ্ধা” পরিচয়ের কারণে আরেকজন ব্যক্তি বিচার ও দায় থেকে মুক্ত থাকবেন—এটি সমতার নীতির সুস্পষ্ট ব্যত্যয়। আইন এখানে অপরাধের ভিত্তিতে নয়, বরং পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রয়োগ হচ্ছে।
আইনের সুরক্ষা থেকে নাগরিক বঞ্চনা (অনুচ্ছেদ ৩১)
অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির ক্ষেত্রে আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এই সুরক্ষার অর্থ হলো—অপরাধ সংঘটিত হলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি রাষ্ট্র ও আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চাইতে পারবেন।
কিন্তু দায়মুক্তি অধ্যাদেশের ফলে ভুক্তভোগীরা কার্যত আদালতের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাষ্ট্র নিজেই বিচার ব্যবস্থার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে নাগরিকের আইনি সুরক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, যা অনুচ্ছেদ ৩১–এর মৌলিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
বিচারিক প্রক্রিয়া ও ক্ষমতার বিভাজন প্রশ্নবিদ্ধ (অনুচ্ছেদ ৩৫)
অনুচ্ছেদ ৩৫ নিশ্চিত করে যে বিচার ও দণ্ড কেবল আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত আদালতের মাধ্যমেই হবে। এর অন্তর্নিহিত দর্শন হলো—অপরাধ ও দায় নির্ধারণের একমাত্র বৈধ কর্তৃত্ব আদালতের হাতে।
দায়মুক্তি অধ্যাদেশ আদালতে যাওয়ার আগেই বিচারিক প্রক্রিয়াকে অকার্যকর করে দিচ্ছে। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে একটি শ্রেণিকে বিচারব্যবস্থার বাইরে রাখা ক্ষমতা পৃথকীকরণ নীতির পরিপন্থী এবং বিচার বিভাগের সাংবিধানিক ভূমিকা দুর্বল করে।
রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতা ও তার সীমা (অনুচ্ছেদ ৯৩)
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩ রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতা প্রদান করেছে, তবে এই ক্ষমতা শর্তসাপেক্ষ ও ব্যতিক্রমধর্মী।
অনুচ্ছেদ ৯৩ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন কেবল তখনই—
(১) যখন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে নেই
(২) যখন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন
এই ক্ষমতা সংসদের আইন প্রণয়নের বিকল্প নয়। অধ্যাদেশ হলো একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা, যা জরুরি পরিস্থিতিতে সংসদের অনুপস্থিতিকালে প্রয়োগযোগ্য।
“তাৎক্ষণিক প্রয়োজন”–এর প্রশ্ন
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন উঠে—
(১) দায়মুক্তি দিতে এমন কী জরুরি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল?
(২) সংসদীয় আইন প্রণয়নের জন্য অপেক্ষা করা কেন সম্ভব ছিল না?
(৩) অধ্যাদেশটি কি সাময়িক, নাকি স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে?
যদি এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না থাকে, তবে অধ্যাদেশটি অনুচ্ছেদ ৯৩–এর শর্ত পূরণ করে না এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাষ্ট্রপতির “সন্তুষ্টি” ও বিচারিক পর্যালোচনা
রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি সম্পূর্ণ বিচারবহির্ভূত নয়। আদালত পরীক্ষা করতে পারে—
(১) প্রকৃতপক্ষে জরুরি অবস্থা ছিল কি না
(২) অধ্যাদেশটি সংবিধানের সীমা অতিক্রম করেছে কি না
(৩) মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না
অতএব, অনুচ্ছেদ ৯৩ কোনোভাবেই মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের লাইসেন্স নয়।
“সর্বরোগের মহৌষধ”-দায়মুক্তি: সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে
বাংলাদেশের সংবিধানে শ্রেণিভিত্তিক, অসীম ও শর্তহীন দায়মুক্তির কোনো স্বীকৃতি নেই। দায়মুক্তি যদি অপরাধের ধরন, সময়সীমা ও বিচারিক তদারকি ছাড়া দেওয়া হয়, তবে তা আইনের শাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
উপসংহার
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ—
(১) অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সমতা লঙ্ঘন করে
(২) অনুচ্ছেদ ৩১ অনুযায়ী নাগরিকের আইনি সুরক্ষা খর্ব করে
(৩) অনুচ্ছেদ ৩৫ অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া ও ক্ষমতার বিভাজন নষ্ট করে
(৪) অনুচ্ছেদ ৯৩ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করে
(৫) সংবিধানের মৌলিক দর্শন (অনুচ্ছেদ ৯)–এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ
এই কারণেই অধ্যাদেশটি সংবিধানবিরোধী, বেয়াইনি এবং বাতিলযোগ্য। সংবিধান কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পক্ষে নয়; সংবিধান জনগণের পক্ষে। রাষ্ট্র যদি সেই সংবিধানের সীমা অতিক্রম করে, তবে তা কেবল আইনের শাসন নয়—রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বৈধতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ডঃ শাহদীন মালিকের মতে সংসদও এর বৈধতা দিতে পারবে না।
আরও পড়ুনঃ মৃত লাশ গেল জীবন্ত লাশ দেখতে








Leave a Reply