শিরোনামটি মানব জমিন পত্রিকার। মানব জমিন বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছে। আমার বিশ্লেষণ হলো-
কোনো অন্তর্বর্তী বা উপদেষ্টা সরকার মূলত সাময়িক। তাদের কাজ নির্বাচন আয়োজন, প্রশাসনিক স্থিতি ফিরিয়ে আনা, এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। কিন্তু যখন দেখা যায়—কিছু উপদেষ্টা নির্ধারিত সময়ের বাইরে প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতা ধরে রাখতে আগ্রহী—তখন প্রশ্ন ওঠে: কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। এর পেছনে কয়েকটি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কারণ কাজ করতে পারে।
রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা
অনেক সময় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা নিজেদের “নিরপেক্ষ” পরিচয়ের আড়ালে একটি নতুন রাজনৈতিক বলয় গড়ে তুলতে চান। তারা সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে না থাকলেও প্রশাসন, নির্বাচন কাঠামো বা নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব রেখে ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে চান।
ইতিহাস বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার কখনো কখনো স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দেয়। যেমন পাকিস্তানে জেনারেল-সমর্থিত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক জোটে পরিণত হয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে Pervez Musharraf-এর সময়কাল উল্লেখ করা যায়।
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের স্বাদ
ক্ষমতা কেবল রাজনৈতিক নয়—এটি প্রশাসনিকও। মন্ত্রণালয়, বাজেট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নিয়োগ—এসব নিয়ন্ত্রণের সুযোগ একবার পেলে তা ছাড়তে অনীহা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় Fakhruddin Ahmed-এর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন “দীর্ঘস্থায়ী সংস্কার” এর যুক্তি দেখিয়ে নির্ধারিত সময়ের বাইরে ক্ষমতা ধরে রেখেছিল। যদিও তাদের উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, তবু রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটি বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
‘সংস্কার অসম্পূর্ণ’ যুক্তি
উপদেষ্টারা প্রায়ই যুক্তি দেন—“সংস্কার শেষ হয়নি”, “ব্যবস্থা ঠিক হয়নি”, “নির্বাচনী পরিবেশ প্রস্তুত নয়”। এই যুক্তি আংশিক সত্য হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংস্কার কি কখনো সম্পূর্ণ হয়? যদি সংস্কারকে অনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া হিসেবে ধরা হয়, তাহলে ক্ষমতায় থাকার অজুহাত অনন্ত হয়ে যায়।
রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ
যদি বড় রাজনৈতিক দলগুলো বিভক্ত থাকে, নেতৃত্ব সংকটে থাকে, বা জনআস্থা কমে যায়—তখন উপদেষ্টারা মনে করতে পারেন, তারাই স্থিতিশীলতার একমাত্র বিকল্প। এই “নৈতিক উচ্চভূমি” থেকে তারা নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকার যৌক্তিকতা দাঁড় করাতে চান।
কিন্তু গণতন্ত্রে নৈতিকতার চূড়ান্ত মানদণ্ড হলো জনগণের ভোট—কোনো প্রশাসনিক দক্ষতা নয়।
ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ হিসাব
ক্ষমতা ছাড়ার পর জবাবদিহি, তদন্ত, বা রাজনৈতিক প্রতিশোধের আশঙ্কাও কখনো ভূমিকা রাখতে পারে। ক্ষমতায় থাকলে সিদ্ধান্তের দায় নিয়ন্ত্রণ করা যায়; ক্ষমতার বাইরে গেলে তা কঠিন হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক সমীকরণ
কখনো কখনো আন্তর্জাতিক শক্তিও স্থিতিশীলতার নামে দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্বর্তী কাঠামোকে সমর্থন দেয়, যদি তারা মনে করে নির্বাচিত সরকার তাদের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নাও হতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সমীকরণের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়।
মূল প্রশ্ন: গণতন্ত্র না প্রশাসনিক অভিভাবকত্ব?
এখানে মৌলিক দ্বন্দ্ব হলো—গণতন্ত্র কি জনগণের হাতে যাবে, নাকি “যোগ্য ও সৎ” বলে বিবেচিত কয়েকজন উপদেষ্টার হাতে থাকবে?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্পষ্টভাবে জনগণের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়। স্বাধীনতার মূল দর্শন ছিল—ক্ষমতার উৎস জনগণ। সুতরাং কোনো উপদেষ্টা যদি অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকতে চান, তবে তা গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়।
উপসংহার
তিন উপদেষ্টা কেন ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন—এর উত্তর হতে পারে:
- রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেষ্টা
- প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আকর্ষণ
- অসম্পূর্ণ সংস্কারের যুক্তি
- রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ
- ব্যক্তিগত নিরাপত্তা
- আন্তর্জাতিক প্রভাব
কিন্তু শেষ কথা একটাই:
অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কখনো স্থায়ী সমাধান নয়। গণতন্ত্রে চূড়ান্ত বৈধতা আসে ব্যালট বাক্স থেকে, বোর্ডরুম থেকে নয়।
সূত্রঃ মানব জমিন








Leave a Reply