শিরিশ চন্দ্র দেবদাস
শিরিশ চন্দ্র দেবদাস ছিলেন রাজবাড়ী জেলার বিখ্যাত জমিদার। পুরান ঢাকার বিখ্যাত শ্রীশ দাস লেন তাঁর নামেই নামকরণ করা হয়। তাঁর জমিদারি পরিচালিত হতো বিশই
সাওরাইল জমিদার বাড়ি থেকে।
| বিশই সাওরাইল জমিদার বাড়ি |
সাওরাইল ইউনিয়নের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হলো বিশই সাওরাইল জমিদার বাড়ি। ইউনিয়নের বিশই সাওরাইল গ্রামে এখনো জমিদার বাড়িটির বিশাল পুকুর, প্রায় ২৫০
বছর পুরাতন মন্দির এবং অন্যান্য প্রাচীন স্থাপনা রয়েছে। এছাড়াও গড়াই নদীর পাড়,
সিরাজপুরের হাওর, ছোট ছোট অসংখ্য খাল এবং সবুজ গ্রাম এই ইউনিয়নকে দিয়েছে অন্যরকম
সৌন্দর্য।
বিশই
সাওরাইল জমিদার বাড়ির লিখিত কোনো ইতিহাস সংগ্রহ করতে পারিনি। তবে জমিদার বাড়ির
উত্তরসুরীদের সাথে সু-সম্পর্কিত ব্যক্তি বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা জনাব নেসার আহমেদ
মান্নার স্মৃতিচারণমূলক একটি লেখা এখানে সন্নিবেশিত করা হলো।
************
বিশই সাওরাইল জমিদার বাড়ীর কিছু ইতিহাস
লিখেছেনঃ
নেসার আহমেদ মান্না
যার যা
নিয়ে দুঃখ!
বিশই
সাওরাইলের জমিদার ছিলেন অশ্বিনী বাবু। তাঁর জমিদার মহলে ছিলো এক বিশাল লাইব্রেরী। তাঁরা
চার ভাই-ই ছিলেন বিদ্যানুরাগী। পাশের জমিদার ছিলেন কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর।
সঙ্গত কারণেই কবি গুরুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আমাদের গ্রামের জমিদার শিরিশ বাবু।
একটা বিষয়ে তাঁদের দুই জমিদারের মিল ছিলো- তা হলো সাহিত্যকলা। লেখালেখিতে তাঁরা
আগাগোড়াই সিদ্ধহস্ত ছিলেন।
কলিকাতায়
ও ঢাকাতে অশ্বিনী বাবুর সহোদর শিরিশ বাবুর নামে দুটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল।
তাঁর নামে ” শিরিশ দাস লেন (শ্রীশ দাস লেন) আজও আছে। এই শিরিশ বাবুর বিদ্যানুরাগ
কিংবদন্তীর মতোই ছিল।
উনিশ
শতকের চল্লিশের দশক পর্যন্ত আমার জন্মের এক দশক আগেই মধ্যস্বত্ব প্রথা বিলুপ্তির
পরে তাঁরা স্থায়ী ভাবে ভারতে চলে যান। তখন পুর্ব পাকিস্থানে এ কে ফজলুল হকের
যুক্তফ্রন্ট সরকার।
যাহোক,
আমার লেখার বিষয়টা জমিদারের লাইব্রেরীটা নিয়ে। এই লাইব্রেরীটাতে কমপক্ষে চার হাজার
বই ছিলো। বিল্ডিংটার দোতলার প্রায় ৩০০ বর্গফুট রুমের উত্তর দেয়াল জুড়েই ছিল দেয়াল
আলমারি। সেটা ঠাসা দুই ইঞ্চি তিন ইঞ্চি মোটা করে চামড়ার বাঁধাই করা গ্রন্থের
সমষ্টি।
| বিশই সাওরাইল জমিদার বাড়ি |
জমিদারী
বিলুপ্ত হবার পর জমিদারের বড় ছেলে অনাথ বাবু (অনাথবন্ধু দেবদাস) সম্ভবতঃ ১৯৭৫-৭৬
সাল পর্যন্ত খুব সুস্থ দেহেই ১০৫ বছর বেঁচে ছিলেন। ১৯৬৩ সালে আমি জমিদার বাড়ির
ভগ্নপ্রায় ভবনের পাশ দিয়ে নাট মন্দিরের সাথের রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতাম। অনাথ বাবু
তখন পোষ্ট মাষ্টার। তাঁর সাথে দেখা করে খোঁজ নিতাম কোনো চিঠি বা মানিঅর্ডার আছে কিনা।
এই সুবাদে বাবুর সাথে আমার খুব স্নেহের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি তাঁকে দাদু ডাকতাম।
তিনি আমাকে স্নেহপরবস হয়ে যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা আজো আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন
শিক্ষা হয়ে আছে। তার একটি হলোঃ ‘প্রাণায়াম যোগ অভ্যাস’ এবং দ্বিতীয়টি হলোঃ ‘বই
পড়ার বাতিক’।
অনাথ
বাবু নিজে হাতে আমাকে যোগ ব্যায়ামের প্রথম পাঠ থেকে এমন শিক্ষা দিয়েছিলেন যা ছিলো
ওই অজ পাড়াগাঁয়ের একজনের কাছে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। তিনি শিখিয়েছিলেন, কিভাবে
দম নিয়ন্ত্রণের দ্বারা ডাক্তার আর ওষুধ ছাড়াই নিরোগ দীর্ঘজীবন লাভ করা যায়। তাঁর
শত বছরের জীবনেও ডাক্তারের বা ওষুধের দরকার হয়নাই। এটা অবিশ্বাস্য হলেও একশতভাগ
সত্য।
আমাকে
সাথে নিয়ে দীঘির পাকা করা ঘাটে গলা পানিতে ডুবে থেকে কি ভাবে দম নিয়ন্ত্রণ করতে হয়,
৮৫ বছর বয়সে তা শিখিয়েছিলেন। ঘড়ি ধরে এক নাগাড়ে ৬ মিনিট তিনি ডুবে থাকতেন আর লাল
সুর্য উদয়ের সাথে আবার উঠতেন। আমি ৩ বছর প্রাক্টিস করে ৪ মিনিট ডুবে থাকতে পারতাম।
যার ফলে আমার সাবালক হবার পর থেকে আজ ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত ডাক্তারের কাছে যাবার
প্রয়োজন হয় নাই।
এটাতো
গেল একটা বিষয়। এরপর আসছে বইপড়ার নেশা। তিনি আমাকে তাঁদের লাইব্রেরীতে নিয়ে গিয়ে
“অপরাজিতা“ চমচম, স্বপন কুমার, শারদীয় মাসিক ভারতবর্ষ, শারদীয় যুগান্তর, মাসিক
বসুমতী, এমন অসংখ্য বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে একটা করে হাতে তুলে দিতেন। ৬০০
থেকে ৭০০ পৃষ্ঠার বইগুলি পড়তে আমার দেড়-দুই মাস সময় লাগতো। তারপর থেকে সেই অজ পাড়াগাঁয়ে
আমাকে তিনি বিভিন্ন সাহিত্য আলোচনার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বানিয়ে ফেলেন।
সেই
অপরিসীম জ্ঞানভান্ডারের একমাত্র পাঠক ছিলাম আমি। আর বাংলা দ্রুত পঠনে আমি অদ্বিতীয়
গতিসম্পন্ন পাঠকে পরিণত হয়েছিলাম মাত্র ১২ বছর বয়সে। উর্দু, হিন্দি, ফার্সি, সংস্কৃত, ইংরেজি ভাষাতেও
তাঁর দখল ছিল অবিশ্বাস্য! তিনি আরবিতেও পারদর্শী ছিলেন। আল কোরআন তিনি গিরীশ
চন্দ্রের অনুবাদ পড়েছিলেন। ‘তালাবুল এলম’ হাদিস বলে আমাকে জ্ঞান অর্জনের জন্য
উৎসাহিত করতেন।
যাক এই
প্রসঙ্গ। এবারে আমার বড়ই দুঃখের ঘটনাটা বলে একটু হাল্কা হই। জমিদারের একমাত্র বোন
ছিলেন সাবিত্রী দেবী। তাঁর কাছে চিঠি লিখতেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর
লেখা ১৯৩৪ সালে দুইটি ফুটো পয়সা দামের অশোক স্তম্ভ পোষ্টকার্ড পেলাম শারদীয়
বসুমতীর পাতার ভাঁজে।
১৯৭১
সালে জমিদার বাড়ির দালানটাকে তাঁর উত্তরসূরিরা আর রক্ষা করতে পারেন নাই। ‘চৈতে
কায়েত’ নামে একজন নায়েব ছিল- সে কিছু স্থানীয় দখলদারদের সাথে করে ভেঙ্গেচুরে ফেলে।
সব লুটে নিলেও ওদের কাছে লাইব্রেরী বা দেড়শো বছরের পুরাতন বইগুলি ছিলো আবর্জনা।
মুক্তিযূদ্ধ
থেকে ফিরে এসে আমার সহপাঠী মনোজ কুমারের সাথে দেখা করতে গিয়ে সেই সমৃদ্ধ
লাইব্রেরীটার পরিত্যাক্ত বইগুলির করুণ দৃশ্য দেখে আমি জ্ঞান হারা হয়ে গিয়েছিলাম।
বড়বাবুর ছেলে মনোজ কুমার দেব দাস আমাকে বইগুলি দান করে দিয়েছিল। আমি কিছু বই আমার
লাইব্রেরীতে এনে রেখেছিলাম। প্রায় ৭০ বছর আগের কিছু বই- ‘ভারতবর্ষ’ বা ‘বসুমতী’ অক্ষত
অবস্থায় উদ্ধার করেছিলাম।
সেই
অমুল্য সম্পদ আমার মামা’নির(মামী) কাছে ঢাকাতে রেখেছিলাম। তার একটার ভিতরেই কবিগুরুর লেখা সেই পোস্টকার্ড
দুইটা ছিলো। মামা’নি আবর্জনা বিদায় করতে পুরনো কাগজ ওয়ালার কাছে চার আনা কেজি দরে
বেচে দিয়েছিলেন।
তাই
আমার যোগ ব্যায়াম করা ইস্পাতের বুকে যে ব্যাথা হয়ে আছে, তা আমাকে মৃত্যু পর্যন্ত
বহন করে যেতে হবে বৈকি!!
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা নেসার আহম্মেদ মান্না
| নেসার আহমেদ মান্না |
উল্লেখ্য, বিশই সাওরাইল জমিদার বাড়ির বর্তমান সদস্যদের সাথে এই ব্লগের
লেখকের একটি সু-সম্পর্ক আছে এবং তিনি এই বাড়িতে গিয়েছেন। নেসার আহমেদ মান্না সাহেবের
বন্ধু মনোজ কুমার দেব দাসের বড় ছেলে মলয় কুমার দেবদাস ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।
মলয় কুমারের মা ডলি রানী দেব দাস আওয়ামীলীগ নেতা এবং সাবেক জেলা পরিষদ কাউন্সিলর।







Leave a Reply