ত্রিপুরা (Tripura/Tipra) বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। তারা প্রধানত খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান ছাড়াও কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের কিছু স্থানে বসবাস করে। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
আগমন ও উৎপত্তি
ত্রিপুরাদের উৎপত্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের ধারণা—
- তারা প্রাচীন তিব্বত-বার্মা ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর অংশ, যারা বহু শতাব্দী আগে উত্তর-পূর্ব ভারত ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।
- ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তারকালে এই জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন শাখা বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে।
- রাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য, গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজ ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি তাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
ধর্মবিশ্বাস
ত্রিপুরা সমাজে ধর্মীয় বৈচিত্র্য দেখা যায়—
- একটি বড় অংশ হিন্দুধর্ম অনুসরণ করে, বিশেষ করে শাক্ত ও বৈষ্ণব প্রভাব রয়েছে।
- কিছু অংশ প্রকৃতি-নির্ভর লোকধর্ম ও পূর্বপুরুষপূজার ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।
- আধুনিক সময়ে অল্পসংখ্যক ত্রিপুরা খ্রিস্টধর্মও গ্রহণ করেছে।
ভাষা
ত্রিপুরাদের ভাষা ককবরক (Kokborok) নামে পরিচিত, যা তিব্বত-বার্মা ভাষাপরিবারভুক্ত।
- দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার ব্যবহারও বাড়ছে।
- ককবরক ভাষা সংরক্ষণে সাংস্কৃতিক উদ্যোগ ও শিক্ষামূলক প্রচেষ্টা রয়েছে।
সংস্কৃতি ও জীবনযাপন
- ঐতিহ্যবাহী পোশাক: নারীদের রিগনাই-রিসা, পুরুষদের ধুতি বা লুঙ্গি-ধরনের পোশাক।
- প্রধান উৎসব: বৈসু/বৈসাবি, গরিয়া পূজা ইত্যাদি।
- জীবিকা: আগে প্রধানত জুম চাষ; বর্তমানে কৃষি, শ্রম, ব্যবসা ও চাকরিতে অংশগ্রহণ বাড়ছে।
- লোকনৃত্য, বাঁশের বাদ্যযন্ত্র, বয়নশিল্প ও উৎসবমুখর সামাজিক জীবন ত্রিপুরা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিক্ষা
ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার প্রসার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণ বাড়ছে।
- নতুন প্রজন্ম উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে।
বিবাহরীতি
- সাধারণত গোষ্ঠী ও পারিবারিক সম্মতি বিবাহের প্রধান শর্ত।
- ধর্মীয় আচার (বিশেষত হিন্দু রীতি) অনুসারে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
- বিয়েতে গান, নৃত্য, ভোজ ও সামাজিক সমাগম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সামাজিক রীতি ও প্রথা
- ত্রিপুরা সমাজ গোষ্ঠীভিত্তিক ও প্রথানির্ভর।
- বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান, পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ।
- গ্রামীণ নেতৃত্ব ও সামাজিক ঐক্য তাদের সমাজজীবনের ভিত্তি।
আনুমানিক জনসংখ্যা
বাংলাদেশে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ২ লক্ষের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।
উপসংহার
ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের পার্বত্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ককবরক ভাষা, গরিয়া পূজা, বৈসাবি উৎসব, জুম-সংস্কৃতি ও গোষ্ঠীভিত্তিক সামাজিক কাঠামো—সব মিলিয়ে তারা একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। আধুনিকতার প্রভাব সত্ত্বেও ত্রিপুরারা তাদের ঐতিহ্য রক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের আদিবাসী সমাজ | মারমা জনগোষ্ঠী: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের পরিচিতি







Leave a Reply