এক উপদেষ্টার মন্তব্য ও বাংলাদেশের রাজনীতির পুরোনো বৃত্ত
ভারতের প্রভাবশালী সাময়িকী The Week-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আলম বলেছেন— “আওয়ামী লীগ থাকলে জামায়াত থাকবে, জামায়াত থাকলে আওয়ামী লীগ থাকবে।” বক্তব্যটি তাৎক্ষণিকভাবে আলোচনার জন্ম দিলেও, বক্তার রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটি একটি বড় রাজনৈতিক ঘোষণার চেয়ে বাস্তবতা-নির্ভর ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
মাহফুজ আলম কোনো প্রতিষ্ঠিত বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি মূলত জুলাই আন্দোলনের পর “মাস্টারমাইন্ড” হিসেবেপরিচয় করিয়ে দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে স্থান পান। নির্বাচন সামনে রেখে উপদেষ্টার পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। তবে পদত্যাগের পর কোনো রাজনৈতিক দলে তার আনুষ্ঠানিক অবস্থান তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে, বর্তমানে তিনি এনসিপি (NCP) সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কাজে যুক্ত রয়েছেন, যদিও দলীয়ভাবে তার ভূমিকা স্পষ্ট নয়।
এই প্রেক্ষাপটে The Week-এ দেওয়া মন্তব্যটি আদর্শগত অবস্থান ঘোষণার চেয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব চিত্রের দিকেই ইঙ্গিত করে – যদিও এনসিপি জামাত জোটে যোগ দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী—এই দুই শক্তি আদর্শগতভাবে মুখোমুখি অবস্থানে থাকলেও বাস্তবে তারা বহু বছর ধরে একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে সংজ্ঞায়িত করে এসেছে। এক পক্ষের উপস্থিতি অন্য পক্ষের জন্য রাজনৈতিক ভাষ্য ও সমর্থনসংহতির সুযোগ তৈরি করেছে—এমন ধারণা নতুন নয়।
মাহফুজ আলমের বক্তব্য সেই পারস্পরিক রাজনৈতিক নির্ভরতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সক্রিয় থাকলে জামায়াতকে ‘প্রতিরোধী শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরা যায়, আবার জামায়াত দৃশ্যমান হলে আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার রক্ষক হিসেবে রাজনৈতিক অবস্থান জোরদার করতে পারে। ফলে দুই পক্ষই একে অপরের অস্তিত্বকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে এসেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, এই মন্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মাহফুজ আলম নিজে বড় কোনো রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারক নন, কিংবা জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মুখও নন। ফলে তার বক্তব্যকে দলীয় অবস্থান বা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। বরং এটি একজন সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতার ভেতর-বাইরের অভিজ্ঞতা পাওয়া ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ বলেই মনে করছেন অনেকে।
আরেকটি দিকও আলোচনায় এসেছে—এই বক্তব্য এমন এক সময় এসেছে, যখন বাংলাদেশ রাজনীতি একটি অনিশ্চিত রূপান্তরপর্বে রয়েছে। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা, আসন্ন নির্বাচন এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে পুরোনো দুই মেরুকেন্দ্রিক রাজনীতির কথাই আবার সামনে চলে আসছে।
সব মিলিয়ে মাহফুজ আলমের মন্তব্য নতুন কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়। তবে এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো সত্যকে আবার সামনে এনেছে—যেখানে বহু সময় আদর্শের লড়াই নয়, বরং প্রতিপক্ষের অস্তিত্বই রাজনীতির চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি আদৌ বেরোতে পারবে কি না, সুষ্ঠ রাজনৈতিক চর্চার ধারা পূনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে কিনা সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেলো।
Ref: TheWeek
আরও পড়ুনঃ
(১) উদয়ের পথে নিঃশব্দ কারিগর শহীদ বুদ্ধিজীবী এ কে এম নূরুল হক
(২) নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যরা ১৮০ দিনের জন্য গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবে








Leave a Reply