উৎপত্তি
তাবলীগ জামাত উপমহাদেশভিত্তিক একটি ইসলামি দাওয়াতি আন্দোলন। এর সূচনা হয় ১৯২৬ সালের দিকে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে। আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি (রহ:)। তিনি মেওয়াত অঞ্চলে সাধারণ মুসলমানদের ধর্মীয় চর্চায় ফেরাতে এ উদ্যোগ নেন।
তাবলীগ জামাতের মূল কার্যক্রম মসজিদকেন্দ্রিক। নামাজ, কালেমা, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত আমলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংগঠনটি শুরু থেকেই রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কথা বলে আসছে।
বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের বিস্তার
বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের বিস্তার ঘটে পাকিস্তান আমল থেকে। স্বাধীনতার পর এটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম ও শহর—সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এটি একটি বড় ধর্মীয় আন্দোলনে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের সবচেয়ে বড় পরিচিতি আসে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের মাধ্যমে। প্রতিবছর এই ইজতেমায় দেশ-বিদেশ থেকে লাখো মুসল্লি অংশ নিয়ে থাকেন।
গুরুত্ব ও প্রভাব
বাংলাদেশের ধর্মীয় সমাজে তাবলীগ জামাত একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে। অনেক মানুষ নিয়মিত নামাজ, ধর্মীয় শৃঙ্খলা ও মসজিদমুখী জীবনে ফিরে আসেন—এমন দাবি করে সংগঠনটি।
ধর্মীয় সহিংসতা ও উগ্রতার বাইরে অবস্থান করায় একসময় এটি একটি নরম ধারার ইসলামি আন্দোলন হিসেবেও পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্র ভিন্ন।
সমালোচনা
তাবলীগ জামাত নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, সংগঠনটি সামাজিক, শিক্ষাগত ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সরাসরি কোনো অবস্থান নেয় না। ফলে সমাজের সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের ভূমিকা সীমিত থাকে। তাছাড়া বাংলাদেশের কিছু আলেমকে এর বিপক্ষে মত প্রকাশ করতে দেখা যায়। কারণ এখানে দূর-দূরান্ত থেকে কষ্ট করে আসা মানুষ শুধু মোনাজাত ছাড়া শিক্ষনীয় কিছু নিয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া প্রায় সব সময় ইজতেমার প্রধান বক্তা থাকে ভিনদেশি অবাঙ্গালি, ফলে বাংলাদেশের, বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের মানুষ যারা আসে তারা বুঝতে না পারায়, বক্তার শ্রম বিফলে যায়।
অভ্যন্তরীণ বিভাজন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাবলীগ জামাতের ভেতরে নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব, আমির নির্বাচন এবং পরিচালন পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ তৈরি হয়।
এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। সংগঠনটি কার্যত একাধিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।
বিশ্ব ইজতেমা সংকট
তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনে। একাধিক পক্ষের দাবিদাওয়া, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে কখনো ইজতেমা বিভক্তভাবে অনুষ্ঠিত হয়, আবার কখনো আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন সময় হস্তক্ষেপ করা হয়। তবুও বিগত বছরগুলোত বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় গত বছর ইজতেমা মাঠে মারামারি হয়। ফলে চলতি বছর (২০২৬) বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
প্রতিক্রিয়া
বিশ্ব ইজতেমা না হওয়া বা সংকটে পড়ায় সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে হতাশা দেখা যায়। আলেম সমাজের একাংশ এটিকে দুঃখজনক ঘটনা হিসেবে দেখছেন।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধর্মীয় সমাবেশে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
উপসংহার
তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের একটি বড় ধর্মীয় বাস্তবতা। এর দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিভাজন ও ইজতেমা সংকট নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আগামী দিনে সংগঠনটির ঐক্য ও কার্যক্রম কোন পথে যাবে—তা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।








Leave a Reply