মরমোনিজম (Church of Jesus Christ of Latter-day Saints) – আধুনিক যুগের এক নবধর্মীয় আন্দোলন
ধর্মের ইতিহাসে এমন কিছু মতবাদ আছে যেগুলো মূলধারার বিশ্বাস থেকে ভিন্ন পথে গিয়ে নতুন ধর্মীয় অধ্যায়ের সূচনা করেছে। মরমোনিজম (Mormonism) বা “Church of Jesus Christ of Latter-day Saints” (LDS Church) তেমনই এক আন্দোলন, যা খ্রিষ্টধর্মের শিকড়ে থেকেও সম্পূর্ণ নতুন এক ধর্মীয় জগৎ সৃষ্টি করেছে।
উৎপত্তি ও প্রতিষ্ঠাতা
মরমোন ধর্মের সূচনা ঘটে ১৮২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জোসেফ স্মিথ (Joseph Smith), যিনি দাবি করেন যে তিনি ঈশ্বর ও যিশু খ্রিষ্টের প্রত্যক্ষ প্রকাশ (revelation) লাভ করেছেন।
১৮৩০ সালে তিনি প্রকাশ করেন এক নতুন ধর্মগ্রন্থ — “The Book of Mormon”, যা তিনি বলেন, প্রাচীন আমেরিকান নবীদের লেখা পবিত্র গ্রন্থ।
জোসেফ স্মিথের ভাষ্য অনুযায়ী, এক ফেরেশতা মরোনি (Moroni) তাঁকে এক ধাতব ফলক (golden plates) দেখান, যেখানে ঈশ্বরের বার্তা খোদাই ছিল। তিনি সেই ফলক “দৈব অনুবাদ” করে “Book of Mormon” নামে প্রকাশ করেন — এখান থেকেই “Mormon” নামটির উৎপত্তি।
মূল বিশ্বাস ও দর্শন
মরমোনদের বিশ্বাস মূলত খ্রিষ্টীয় ধর্মমতের সঙ্গে যুক্ত হলেও কিছু ক্ষেত্রে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
ঈশ্বর ও ত্রিত্ববাদের ধারণা
মরমোনরা মনে করেন ঈশ্বর (God the Father), যিশু খ্রিষ্ট (Jesus Christ) ও পবিত্র আত্মা (Holy Ghost) — তিনটি স্বতন্ত্র সত্তা। অর্থাৎ প্রচলিত খ্রিষ্টীয় “ত্রিত্ববাদ” (Trinity) ধারণার বিপরীতে তারা “তিন ঈশ্বরের এক উদ্দেশ্য” বলে বিশ্বাস করে।
ধর্মগ্রন্থ
মরমোনরা বাইবেলের পাশাপাশি Book of Mormon, Doctrine and Covenants এবং Pearl of Great Price—এই তিনটি অতিরিক্ত গ্রন্থকেও সমানভাবে পবিত্র মনে করেন।
মানুষের আত্মা ও পরকাল
তাদের মতে, মানুষের আত্মা ঈশ্বরের সন্তানরূপে পূর্বজগতে (pre-mortal existence) ছিল। পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া মানে হলো ঈশ্বরের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা। মৃত্যুর পর আত্মা আবার ঈশ্বরের রাজ্যে ফিরে যায়। তবে এই রাজ্য তিন স্তরে বিভক্ত—“Celestial”, “Terrestrial” ও “Telestial”—যেখানে আত্মার ধর্মাচার অনুযায়ী স্থান নির্ধারিত হয়।
পরিবার ও চিরস্থায়ী বন্ধন
মরমোনিজমে পরিবার হলো ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু। তারা বিশ্বাস করে, ঈশ্বরের বিধান অনুযায়ী বিবাহ হলে সেই সম্পর্ক মৃত্যুর পরেও টিকে থাকে—যাকে বলা হয় “Eternal Marriage” বা চিরস্থায়ী বিবাহবন্ধন।
ধর্মীয় চর্চা ও জীবনধারা
মরমোনদের জীবনযাপন অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। তারা অ্যালকোহল, তামাক, ক্যাফেইন ও অবৈধ যৌনাচার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে।
তাদের চার্চে কোনো বেতনভুক্ত পুরোহিত নেই; বরং সাধারণ সদস্যরাই ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেন।
তারা সমাজসেবা, শিক্ষা এবং দাতব্য কার্যক্রমে খুব সক্রিয়। বিশেষ করে দুই বছরের স্বেচ্ছাসেবী ধর্মপ্রচার কার্যক্রম (Missionary Work) মরমোন তরুণদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আচার। সারা বিশ্বে লক্ষাধিক মরমোন মিশনারি বিভিন্ন দেশে ধর্মপ্রচার করে থাকেন।
বিতর্ক ও সমালোচনা
মরমোনিজম প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল।
জোসেফ স্মিথ বহুবিবাহ (polygamy) সমর্থন করতেন, যা ১৯ শতকের আমেরিকান সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরে ১৮৯০ সালে LDS চার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বহুবিবাহ বন্ধ ঘোষণা করে।
এছাড়াও, তাদের “বর্ণবৈষম্য নীতি” (যেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের পুরোহিতপদে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল) নিয়ে সমালোচনা হয়; যদিও ১৯৭৮ সালে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
আধুনিক উপস্থিতি
আজ মরমোনিজম বিশ্বের দ্রুতবর্ধনশীল ধর্মগুলির একটি।
Church of Jesus Christ of Latter-day Saints-এর সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের সল্ট লেক সিটি, উটাহ (Salt Lake City, Utah)-তে অবস্থিত।
বর্তমানে তাদের অনুসারীর সংখ্যা ১৬ মিলিয়নেরও বেশি এবং চার্চটির কার্যক্রম ১৭০টিরও বেশি দেশে বিস্তৃত।
তারা বিশাল মন্দির (Temple), বিশ্ববিদ্যালয় (Brigham Young University) এবং মানবিক সহায়তা সংস্থা পরিচালনা করে, যা বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদান রাখছে।
উপসংহার
মরমোনিজম এমন এক ধর্মীয় আন্দোলন যা একদিকে খ্রিষ্টধর্মের পুনরুজ্জীবন দাবি করে, অন্যদিকে সম্পূর্ণ নতুন আধ্যাত্মিক দর্শনের জন্ম দিয়েছে।
তাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রে আছে পরিবার, মানবিকতা, আত্মার উন্নতি ও ঈশ্বরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক।
যদিও শুরুতে বহু বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তবুও মরমোনিজম আজ এক বিশ্বজনীন ধর্মীয় সম্প্রদায়, যেখানে ঐশী প্রকাশ, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে এক বিশেষ জীবনদর্শন গড়ে উঠেছে।








Leave a Reply