রচনার প্রেক্ষাপট
১৭শ শতকে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের শাসনামলে (১৬৫৮–১৭০৭) ভারতবর্ষে একটি বড় প্রশাসনিক ও আইনি সংকট তৈরি হয়। বিশাল সাম্রাজ্যে মুসলিম ও অমুসলিম—উভয় জনগোষ্ঠীর ওপর শাসন চালাতে গিয়ে শরিয়াহভিত্তিক বিচার ও ফতোয়া ব্যবস্থায় একই ধরণের আইনী ব্যবস্থা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তৎকালীন ইসলামী আইনচর্চা ছিল ছড়ানো-ছিটানো—হানাফি মাজহাবের বিভিন্ন গ্রন্থ, ইমামদের মতভেদ, আঞ্চলিক ক্বাযিদের নিজস্ব ব্যাখ্যা ইত্যাদির কারণে বিচার ব্যবস্থায় অসামঞ্জস্য দেখা দিচ্ছিলো। এই প্রেক্ষাপটে আওরঙ্গজেব সিদ্ধান্ত নেন, হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য মতামতগুলোকে একত্র করে একটি প্রামাণ্য ফতোয়া সংকলন তৈরি করা হবে, যা প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় ব্যবহার করা যাবে।
এই উদ্যোগ থেকেই জন্ম নেয় ফতোয়া-ই-আলমগিরি (অন্য নাম: আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া)।
রচনার উদ্দেশ্য
ফতোয়া-ই-আলমগিরি রচনার মূল উদ্দেশ্যগুলো ছিলো—
১। শাসন ও বিচারকে মানসম্মত করা
সাম্রাজ্যজুড়ে একই ধরনের মামলায় একই রকম রায় নিশ্চিত করা। যেন ব্যক্তিগত মত বা আঞ্চলিক রীতির কারণে বিচারে বৈষম্য না হয়।
২। হানাফি ফিকহকে রাষ্ট্রীয় আইনের ভিত্তি করা
মুঘল সাম্রাজ্যে হানাফি মাজহাব ছিল সরকারি মাজহাব। এই গ্রন্থের মাধ্যমে হানাফি ফিকহকে একটি সংকলিত, ব্যবহারযোগ্য রূপ দেওয়া হয়।
৩। ক্বাযি ও প্রশাসকদের জন্য রেফারেন্স তৈরি
বিচারক, মুফতি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—সে জন্য বিষয়ভিত্তিক, সাজানো ফতোয়ার একটি গ্রন্থ প্রয়োজন ছিলো।
৪। ধর্মীয় কর্তৃত্বকে রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত করা
ধর্মীয় আইনকে শাসন কাঠামোর অংশ করে তোলা—এতে শাসনের নৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতা জোরদার হয়।
রচনাপদ্ধতি ও কাঠামো (সংক্ষেপে)
আওরঙ্গজেব প্রায় ৪০ জন খ্যাতনামা আলেমকে এই কাজে নিয়োজিত করেন। তাঁরা হানাফি ফিকহের ক্লাসিক গ্রন্থ—যেমন হিদায়া, বাদায়েউস সানায়ে, ফতোয়া ক্বাযিখান ইত্যাদি—থেকে মতামত সংকলন করেন।
গ্রন্থটি ইবাদত, লেনদেন, পারিবারিক আইন, ফৌজদারি আইন, দাসপ্রথা, জিজিয়া, যুদ্ধ, উত্তরাধিকার—এভাবে অধ্যায়ভিত্তিক সাজানো।
কার্যকারিতা ও প্রভাব
১। প্রশাসনিক কার্যকারিতা
ফতোয়া-ই-আলমগিরি দীর্ঘদিন মুঘল আমলে আদালত ও প্রশাসনে ব্যবহৃত হয়েছে। বিচার ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত শৃঙ্খলা তৈরি হয়, যদিও তা পুরোপুরি আধুনিক আইনের মতো ছিলো না।
২। উপনিবেশিক যুগে প্রভাব
ব্রিটিশরা ভারত দখলের পর মুসলিম পার্সোনাল ল–এর ক্ষেত্রে এই গ্রন্থকে অন্যতম রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে এটি শুধু ধর্মীয় নয়, ঔপনিবেশিক আইনব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলে।
৩। ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে সীমাবদ্ধতা
এটি কোনো ওহিভিত্তিক গ্রন্থ নয়, বরং ফিকহি মতামতের সংকলন। তবু অনেক ক্ষেত্রে একে চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় “ইসলামী আইন” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা ঐতিহাসিকভাবে প্রশ্নযোগ্য।
৪। সমালোচনামূলক দিক
- এটি একটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত ফিকহ গ্রন্থ, ফলে শাসকের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব থাকা অস্বাভাবিক নয়।
- সমাজ ও সময় পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা এতে সীমিত।
- আধুনিক মানবাধিকার ও নাগরিক আইনের সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে এর সংঘাত দেখা যায়।
উপসংহার
ফতোয়া-ই-আলমগিরি ছিলো তার সময়ের প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া একটি প্রশাসনিক-ধর্মীয় প্রকল্প। এটি ইসলামের মৌলিক গ্রন্থ নয়, বরং হানাফি ফিকহের একটি ঐতিহাসিক সংকলন—যার মূল্য আছে তার প্রেক্ষাপটে, কিন্তু যাকে সময়-নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন আইন হিসেবে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এটি বুঝতে পারলেই ধর্ম, ইতিহাস ও রাজনীতির পার্থক্যটি পরিষ্কার হয়।
আরও পড়ুনঃ ধর্মচিন্তা | নারীর পোশাক ও জনসমক্ষে উপস্থিতিঃ হাদিসের আলোকে বাংলাদেশের বাস্তবতা নিয়ে পর্যালোচনা







Leave a Reply