দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে ফতোয়া-ই-আলমগিরি। বহু মাদ্রাসায় এটি পড়ানো হয় এবং কিছু রাজনৈতিক-ধর্মীয় গোষ্ঠী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এর বিধান কার্যকর করার আহ্বান জানায়।
ইতিহাসের একটি গ্রন্থ হিসেবে এটি অধ্যয়নে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যখন এটিকে সরাসরি মুসলমানদের চিরস্থায়ী ধর্মীয় বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—সেখানেই প্রশ্নের সূত্রপাত।
১। রচনার ঐতিহাসিক বাস্তবতা
ফতোয়া-ই-আলমগিরি রচিত হয় মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর-এর শাসনামলে – একটি আইন হিসেবে। সেই সময়ের বাস্তবতা ছিল—
- বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার প্রশাসনিক চাপ
- বিচারে একরূপতার প্রয়োজন
- ধর্মীয় বৈধতার মাধ্যমে শাসনকে শক্তিশালী করা
এই প্রেক্ষাপটে হানাফি ফিকহের বিভিন্ন মত একত্র করে একটি ব্যবহারিক আইনসংকলন তৈরি করা হয়। অর্থাৎ এটি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার সহায়ক আইনি দলিল, সরাসরি ধর্মীয় ওহি বা গ্রন্থ নয়।
২। আইন পরিবর্তনশীল—ইতিহাস তার সাক্ষী
ইতিহাসে কোনো আইন স্থির থাকেনি।
মুঘল শাসনের পর এসেছে উপনিবেশিক যুগ, বিশেষ করে ব্রিটিশ শাসন—যেখানে নতুন আইনি কাঠামো প্রবর্তিত হয়।
আজও দক্ষিণ এশিয়ার বহু রাষ্ট্রে—
- ব্রিটিশ আমলের দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের সংশোধিত রূপ চলছে
- সংসদ নতুন আইন তৈরি করছে
- আদালত ব্যাখ্যার মাধ্যমে আইন পরিবর্তন করছে
অর্থাৎ রাষ্ট্রের আইন সর্বদা সময়নির্ভর—এটাই স্বাভাবিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। ঐতিহাসিকগণের মতে সম্রাট আলমগীরের উত্তরসূরী, এমনকি নবীজির উত্তরসূরীও কেউ দেশ পরিচালনা করলে সময়ের প্রয়োজনে নতুন নতুন আইন তৈরি করতেন।
৩। তাহলে কেনো পুরোনো আইনে ফিরে যাওয়ার দাবি?
কিছু মাদ্রাসাকেন্দ্রিক চিন্তাধারায় ফতোয়া-ই-আলমগিরিকে পুনরায় কার্যকর করার প্রবণতার পেছনে কয়েকটি কারণ দেখা যায়—
ক) ধর্ম ও ইতিহাসের পার্থক্য অস্পষ্ট হওয়া
মানুষ-রচিত ফিকহি বিধানকে অনেক সময় সরাসরি “ধর্ম” হিসেবে শেখানো হয়। ফলে ঐতিহাসিক আইনও চিরন্তন বলে মনে হয়।
খ) পরিচয়-রাজনীতি
আধুনিকতার চাপে ধর্মীয় পরিচয়কে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার মানসিকতা তৈরি হয়। পুরোনো আইনি কাঠামো তখন “স্বর্ণযুগের প্রতীক” হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গ) আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস
দুর্নীতি, বৈষম্য ও রাজনৈতিক সংকট মানুষকে অতীতে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। তখন মনে হয়—পুরোনো ধর্মীয় আইনই হয়তো ন্যায় আনতে পারবে।
ঘ) শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
সমসাময়িক আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও মানবাধিকার বিষয়ে সমন্বিত শিক্ষা না থাকলে ইতিহাসকেই বর্তমান সমাধান মনে হওয়া সহজ হয়।
৪। ধর্মীয় মূল্যবোধ বনাম রাষ্ট্রের আইন
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বোঝা জরুরি—
- ধর্মের নৈতিকতা → ন্যায়, সত্য, মানবিকতা
- রাষ্ট্রের আইন → সময়, সমাজ ও রাজনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মিত কাঠামো
ফতোয়া-ই-আলমগিরি নৈতিক শিক্ষা নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক আইনসংকলন।
তাই এটিকে ইতিহাস হিসেবে সম্মান করা যায়, কিন্তু হুবহু বর্তমান রাষ্ট্রে প্রয়োগ করা বাস্তবসম্মত নয়।
৫। সমকালীন চ্যালেঞ্জ
আজকের রাষ্ট্রব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে—
- নাগরিক সমতা
- গণতান্ত্রিক আইনপ্রণয়ন
- মানবাধিকার ধারণা
- বৈশ্বিক আইনি কাঠামো
১৭শ শতকের সাম্রাজ্যিক আইনের সঙ্গে এই কাঠামোর স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য থাকবে।
এই পার্থক্যকে অস্বীকার করলে সংঘাত অনিবার্য।
উপসংহার
ফতোয়া-ই-আলমগিরি ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দলিল—
কিন্তু এটি চিরস্থায়ী ধর্মীয় আইন নয়, বরং একটি সময়নির্ভর রাষ্ট্রিক আইনি সংকলন।
ইতিহাসকে ইতিহাস হিসেবে পড়া জ্ঞান বাড়ায়।
কিন্তু ইতিহাসকে বর্তমানের ওপর চাপিয়ে দিলে বাস্তবতা ও ধর্ম—দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আজকের প্রয়োজন অতীতে ফিরে যাওয়া নয়;
বরং ধর্মের নৈতিক চেতনাকে ধারণ করে সময়ের উপযোগী ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ।
আরও পড়ুনঃ ফতোয়া-ই-আলমগিরি: রচনার প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা






Leave a Reply