সম্প্রতি সংবিধান সংস্কারক আলী রীয়াজের দেওয়া বক্তব্য— ‘নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ১৮০ দিনের জন্য গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবেন’— যা স্বাভাবিক সংসদীয় কাঠামোর বাইরে একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক প্রস্তাব। বাংলাদেশে সংসদ এবং গণপরিষদ এক নয়; এ দুটির ভূমিকা, বৈধতা ও সাংবিধানিক ভিত্তি আলাদা। প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি সংসদ নির্বাচন হচ্ছে, নাকি গণপরিষদ। কিন্তু সংবিধানে যেহেতু গণপরিষদ নাই, সেহেতু এই সংবিধানের অধীনে গণপরিষদ নির্বাচন হয় কি করে? ফলে এই ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, আইনি বৈধতা এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে আসছে, যার চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন বিজ্ঞ আইনজ্ঞ ও বিশ্লেষকগন।
প্রথমত, এই প্রস্তাবের অন্তর্নিহিত কারণের দিকে তাকালে বোঝা যায়, মূল লক্ষ্য হতে পারে সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের জন্য একটি বিশেষ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট তৈরি করা। ১৯৭২ সালে গণপরিষদ সংবিধান প্রণয়ন করেছিল। বর্তমান সংবিধানে যদিও সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত, তবুও ‘গণপরিষদ’ শব্দটি ব্যবহার করে একটি ব্যতিক্রমী ও অতিরিক্ত বৈধতার আবরণ তৈরি করার চেষ্টা স্পষ্ট। এতে সাধারণ সংশোধনের বাইরে গিয়ে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনার রাজনৈতিক যুক্তি দাঁড় করানো সহজ হয়।
দ্বিতীয়ত, এই ঘোষণার মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ কার্যত দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। নির্বাচন সম্পন্ন হলেও যদি সংসদ পূর্ণাঙ্গ আইনপ্রণয়নকারী হিসেবে সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় না হয়ে ১৮০ দিন গণপরিষদের ভূমিকায় থাকে, তাহলে বাস্তব রাষ্ট্রক্ষমতা কার হাতে থাকবে—এই প্রশ্ন ওঠে। বাস্তবে তা বর্তমান অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকার সুযোগ তৈরি করে। অর্থাৎ নির্বাচন হলেও ক্ষমতার প্রকৃত হস্তান্তর বিলম্বিত হতে পারে।
তৃতীয়ত, এই সময়কে কাজে লাগিয়ে কিছু বিতর্কিত বা কঠিন আইন ও সাংবিধানিক পরিবর্তন পাস করানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রশাসনিক পুনর্গঠন, বিচারব্যবস্থা বা নিরাপত্তা কাঠামো সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোকে ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠন’ বা ‘নতুন বন্দোবস্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করলে রাজনৈতিক প্রতিরোধ তুলনামূলকভাবে দুর্বল করা সম্ভব।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রস্তাব বেশ কিছু জটিলতা সৃষ্টি করে। বর্তমান সংবিধানে সংসদ নির্বাচনের পর গণপরিষদ হিসেবে কাজ করার কোনো ধারা নেই। সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাংবিধানিকভাবে সংসদ সদস্য; গণপরিষদের সদস্য হওয়ার কোনো স্বয়ংক্রিয় বা বিকল্প ব্যবস্থা সংবিধানে উল্লেখ নেই। ফলে প্রশ্ন ওঠে—কোন আইনি ক্ষমতায় সংসদকে গণপরিষদে রূপান্তর করা হবে?
আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো সংসদের শপথ ও কার্যক্রম। সংসদ সদস্যরা যদি সাংবিধানিক শপথ গ্রহণ করেন, তাহলে তারা সংসদ হিসেবেই কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। আর যদি শপথ গ্রহণ না করেন, তাহলে তাদের সাংবিধানিক অবস্থান কী—এই বিষয়টি অস্পষ্ট থেকে যায়। এই দ্বৈত অবস্থান সংসদের বৈধতা ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে—সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের হাতে এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে তা করতে হবে। গণপরিষদের ধারণা সামনে এনে এই পদ্ধতির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তা ‘extra-constitutional arrangement’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এতে সুপ্রিম কোর্টে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ আসার সম্ভাবনা প্রবল।
সাংবিধানিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সমর্থকরা বলতে পারেন—জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সার্বভৌম ক্ষমতার বাহক এবং প্রয়োজনে তারা গণপরিষদের মতো ভূমিকা পালন করতে পারেন। এটিকে তারা একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা দিতে চাইবেন। তবে বিপরীতে শক্ত যুক্তি হলো—সংবিধান নিজেই তার পরিবর্তনের পথ নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং সেই পথের বাইরে গিয়ে কোনো কাঠামো দাঁড় করানো মানেই সংবিধান লঙ্ঘন। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা অতীতে বারবার মৌলিক কাঠামো রক্ষার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের ১৮০ দিনের জন্য গণপরিষদ হিসেবে কাজ করার প্রস্তাবটি সাধারণ গণতান্ত্রিক রীতি নয়। এটি একটি নিয়ন্ত্রিত রূপান্তরকাল তৈরি করার উদ্যোগ, যেখানে নির্বাচন হলেও ক্ষমতার পূর্ণ হস্তান্তর বিলম্বিত থাকতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়ন এবং কিছু নির্দিষ্ট আইন বা সাংবিধানিক পরিবর্তন পাস করানোর কৌশল—এই দুই সম্ভাবনাই একে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে। রাজনৈতিক ভাষ্যে এটিকে সংস্কার ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ বলা হলেও, আইনি ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ এড়ানো এই প্রস্তাবের জন্য সহজ হবে না।
উল্লেখ্য, এই ঘোষণার পরপরই আরেক ঘোষণায় ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে ডঃ আলী রীয়াজ – “১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে পরবর্তী সংসদ।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘প্রডিগাল সন’: তারিক রহমানকে যেভাবে দেখছে টাইম ম্যাগাজিন








Leave a Reply