শিরোনামটি প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার। বাংলাদেশে আওয়ামীলীগ সমর্থকদের মাঝে প্রচলিত আছে আল-জাজিরা সব সময় আওয়ামী বিরোধী অবস্থান নেয়। ইতোপূর্বে বিতর্কিত প্রতিবেদন এই মাধ্যম থেকে প্রচারিত হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদনটি একটু তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। ;
আল জাজিরার প্রতিবেদনের শিরোনাম, “Can Bangladesh’s Awami League survive election ban, ex-PM Hasina’s exile?” মূলত একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু হলেও, এর গভীরতা তৈরি হয়েছে মাঠের বাস্তবতা থেকে নেওয়া দুই সাধারণ মানুষের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। এই দুই কণ্ঠ—একজন মাছ ধরার জেলে ও একজন রিকশাচালক—প্রতিবেদনটির রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে বাস্তব ও স্পর্শযোগ্য করে তুলেছে।
নীরব দেয়াল, বন্ধ শাটার: প্রকাশহীন সমর্থনের রাজনীতি
প্রতিবেদনটির শুরুতেই আল জাজিরা পাঠককে নিয়ে যায় রাজবাড়ী জেলায় পদ্মা নদীর তীরবর্তী এক ভোরের দৃশ্যে। রাতভর মাছ ধরা শেষে জেলে রিপন মৃধা যখন হাত-পা ধৌত করছিলেন, তখন তাঁর চোখ পড়ছিলো আশপাশের বাজারের দেয়াল ও দোকানের শাটারে। এই দৃশ্য কেবল বর্ণনামূলক নয়—এটি একটি রাজনৈতিক সংকেত।
রাজবাড়ী জেলার পাড়াটি বড় বড় পোস্টার এবং ব্যানারে ছেয়ে গিয়েছিলো, যেখানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ দলের স্থানীয় রাজনীতিবিদদের মুখ উজ্জ্বল দেখাচ্ছিলো।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দেয়াল ও শাটার মানেই পোস্টার, স্লোগান, প্রতীক। কিন্তু রিপনের চোখে সেগুলোর অনুপস্থিতি আল জাজিরার ভাষায় বোঝায়—আওয়ামী লীগ এখনো মানুষের স্মৃতিতে থাকলেও পাবলিক স্পেস থেকে কার্যত অদৃশ্য। এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে সমর্থন রয়েছে, কিন্তু তা প্রকাশ করার সাহস বা সুযোগ নেই। নির্বাচন নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দলটির উপস্থিতিকে দৃশ্যমান রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, আজীবন আওয়ামী লীগের ভোটার রিপন মৃধা বলেন, তিনি যে দলটিকে সমর্থন করেছিলেন তাকে নিষিদ্ধ করার পর নির্বাচন নিয়ে তার খুব একটা উৎসাহ নেই। তিনি হয়তো এখনও ভোট দিতে পারেন, কিন্তু কাকে সমর্থন করবেন তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, কারণ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক ব্যালটে থাকবে না।
প্রায় ৫০ বছর বয়সী নৌকার মাঝি বলেন, তার পরিবার আশঙ্কা করছে যে যদি তারা ভোট না দেয়, তাহলে তারা আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
গোপালগঞ্জেও প্রশ্ন: দুর্গ কি ফাটতে শুরু করেছে?
এই নীরবতার চিত্র আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আল জাজিরা গোপালগঞ্জের একজন রিকশাচালক সোলায়মান মিয়ার কথা তুলে ধরে। গোপালগঞ্জ শুধু একটি জেলা নয়—এটি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান, তাঁর সমাধিস্থল এবং আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক শক্তির প্রতীক। ১৯৯১ সালের পর থেকে শেখ হাসিনা প্রতিটি নির্বাচনে এখান থেকে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে গোপালগঞ্জের একজন সাধারণ রিকশাচালকের কণ্ঠ তুলে ধরা মানে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—প্রশ্ন এখন আর ঢাকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটির সাধারণ মানুষের মনেও অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী রিকশাচালক সোলাইমান মিয়া দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন যে তিনি এবং তার পরিবার এই বছর ভোট দেবেন না। “ব্যালটে নৌকা ছাড়া নির্বাচন কোনও নির্বাচন নয়,” তিনি আল জাজিরাকে বলেন, গোপালগঞ্জের অনেক বাসিন্দার এই অনুভূতি।
নেতৃত্ব সংকট ও মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা
প্রতিবেদনটি শেখ হাসিনার নির্বাসনকে শুধু একটি আইনি বা কূটনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখে না। বরং রিপন ও সোলায়মানের পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়—হাসিনার অনুপস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা তৈরি করেছে। তিনি কেবল দলের সভাপতি নন, বরং দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর অনুপস্থিতিতে তৃণমূল সমর্থকেরা দিশাহীন, অপেক্ষমাণ ও দ্বিধাগ্রস্ত।
আল জাজিরার প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হচ্ছে – আওয়ামী লীগ এখনো বৃহৎ সামাজিক ভিত্তি ও ইতিহাসনির্ভর একটি দল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা, নেতৃত্ব সংকট ও আন্তর্জাতিক নির্লিপ্ততা দলটিকে কোণঠাসা করেছে।
সারকথা
রিপন মৃধা ও সোলায়মান মিয়া এই প্রতিবেদনে কেবল উদ্ধৃত ব্যক্তি নন—তাঁরাই আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক। তাঁদের নীরবতা ও প্রশ্নই বলে দেয়, দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে নিষেধাজ্ঞায় নয়, বরং এই নীরব তৃণমূলকে আবার কীভাবে বিশ্বাসে ফেরানো যায়—তার ওপর।
আরও পড়ুনঃ
(১) বৈদেশিক ঋণ ২৪ লক্ষ কোটি টাকা: বাংলাদেশে ঋণ বেড়েছে, দায় কার?
(২) আফগানিস্তানে বর্ণ ও দাসপ্রথার আইনি স্বীকৃতি এবং আলেমদের দায়মুক্তি
(৩) আওয়ামীলীগ থাকলে জামায়াত থাকবে, জামায়াত থাকলে আয়ামীলীগ থাকবেঃ মাহফুজ আলম








Leave a Reply