একটা ভিডিওতে দেখলাম, বেশ পরিচিত একজন ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে খুব জোর দিয়ে বারবার বলছেন, ‘কেউ চুরি করলে তার হাত কেটে দিতে হবে। কিন্তু তার পরের আয়াতে আল্লাহ কি বলেছেন তা আর বলছেন না। এই নিবন্ধে তার উদ্ধৃতি দেয়া কোরআনের আয়াত নিয়ে আলোওনা করবো।
সূরা আল-মায়িদা (আয়াত ৫:৩৮–৪০) মূল আরবি আয়াত
آية ٣٨:
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءًۢ بِمَا كَسَبَا نَكَالًۭا مِّنَ ٱللَّهِ ۗ وَٱللَّهُ عَزِيزٌۭ حَكِيمٌۭ
আয়াত ৩৯:
فَمَن تَابَ مِنۢ بَعْدِ ظُلْمِهِۦ وَأَصْلَحَ فَإِنَّ ٱللَّهَ يَتُوبُ عَلَيْهِ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ
আয়াত ৪০:
أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ ٱللَّهَ لَهُۥ مُلْكُ ٱلسَّمَـٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ ۚ يُعَذِّبُ مَن يَشَآءُ وَيَغْفِرُ لِمَن يَشَآءُ ۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍۢ قَدِيرٌۭ
অনুবাদ (বাংলা)
৩৮: “চোর, পুরুষ বা নারী — উভয়েরই হাত কেটে দাও, এটি তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল হিসেবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”
৩৯: “কিন্তু যে ব্যক্তি অন্যায়ের পর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে, আল্লাহ নিশ্চয়ই তার তওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।”
৪০: “তুমি কি জানো না যে আসমান ও জমিনের মালিকানা আল্লাহরই? তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন; আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।”
ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ
চুরির শাস্তির উদ্দেশ্য: ন্যায় প্রতিষ্ঠা, প্রতিশোধ নয়
এই আয়াতগুলো প্রায়ই শুধুমাত্র “হাত কেটে দাও” বাক্যাংশের কারণে ভীতিকর মনে হয়। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য শাস্তি নয়, বরং সমাজে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
ইসলামে শাস্তির ধারণা প্রতিশোধমূলক নয়; বরং প্রতিরোধমূলক ও নৈতিক পুনর্গঠনমূলক।
এখানে “নাকালাম মিনাল্লাহ” অর্থাৎ “আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি”— মানে সমাজে এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করা যাতে কেউ সহজে অপরাধে লিপ্ত না হয়।
এটি একধরনের ‘ডিটারেন্স ল’ (Deterrence Law) — যা অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য কড়া শাস্তি নির্ধারণ করে।
চুরির শাস্তি প্রয়োগের শর্তাবলি
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, এই শাস্তি (হাত কাটা) প্রতিটি চোরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে তবেই তা কার্যকর হয়:
- চুরি করতে হবে স্পষ্ট প্রমাণসহ, গোপনে, ইচ্ছাকৃতভাবে।
- চুরি করা সম্পদ হতে হবে নিরাপদ স্থানে রক্ষিত।
- চুরি করা বস্তু হতে হবে নির্দিষ্ট মূল্যের উপরে।
- দারিদ্র্য, ক্ষুধা বা অন্যায় পরিস্থিতি থাকলে এই শাস্তি আরোপ হয় না।
অর্থাৎ ইসলাম একপাশে কঠোর হলেও অপর পাশে অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠ ও মানবিক।
তওবা ও সংশোধনের সুযোগ
আয়াত ৩৯ এ আল্লাহ বলেন—
“যে ব্যক্তি অন্যায়ের পর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে, আল্লাহ নিশ্চয়ই তার তওবা কবুল করেন।”
এটি ইসলামি বিচারব্যবস্থার একটি গভীর মানবিক দিক।
এখানে বোঝানো হয়েছে যে, মানুষ অপরাধ করলেও তার জন্য চিরতরে দরজা বন্ধ নয়।
তওবার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি সম্ভব এবং সমাজকেও তা ক্ষমার পথ দেখাতে শেখানো হয়েছে।
আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমা ও ন্যায়বিচার (আয়াত ৪০)
শেষ আয়াতে বলা হয়েছে—
“আসমান ও জমিনের মালিকানা আল্লাহরই; তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন, যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।”
এখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ঘোষণা আছে।
কোন শাস্তিই তাঁর ইচ্ছার বাইরে নয় এবং কোন ক্ষমাও তাঁর সীমার বাইরে নয়।
অর্থাৎ মানুষের বিচার সীমিত, কিন্তু আল্লাহর বিচার অসীম।
এই আয়াত ন্যায়বিচারের সঙ্গে করুণার ভারসাম্য স্থাপন করে— যা ইসলামি আইনের সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
সারসংক্ষেপ
সূরা আল-মায়িদার এই তিনটি আয়াতে তিনটি স্তরে বার্তা দেওয়া হয়েছে:
- ন্যায়বিচার: অপরাধের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করে সমাজে নীতি ও নিরাপত্তা রক্ষা।
- মানবিকতা: তওবা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ দিয়ে অপরাধীকে সংশোধনের পথ দেওয়া।
- ঈশ্বরীয় সার্বভৌমত্ব: সর্বশেষ সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে; তিনি বিচারক এবং দয়াশীল উভয়ই।
এইভাবে ইসলাম শাস্তি, ন্যায় ও করুণা—এই তিনের এক অনন্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে। আর এ কারণেই যুগে যুগে ইসলামী চিন্তাবিদরা ও আইনবিদরা এই আয়াত তিনটির আলোকেই আইন প্রণয়ন করেছেন, যাতে সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। চুড়ান্ত বিচারক একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ।








Leave a Reply