ছাবাড–লুবাভিচ (Chabad–Lubavitch): উৎপত্তি, দর্শন, আচার–অনুশীলন ও বৈশ্বিক প্রভাব
ছাবাড–লুবাভিচ হলো হাসিদিক ইহুদিবাদের সবচেয়ে সুপরিচিত ও বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ধারাগুলোর একটি। “ছাবাড” শব্দটি তিনটি হিব্রু শব্দের আদ্যাক্ষর—Chochmah (জ্ঞান/বুদ্ধির ঝলক), Binah (বিশ্লেষণ) এবং Da’at (জ্ঞানের আত্মস্থকরণ)—থেকে এসেছে। এ তিনটি ধারণাই ছাবাড দর্শনের মূল ভিত্তি, যা নির্দেশ করে যে মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে মেধা, চিন্তা ও উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে “লুবাভিচ” নামটি এসেছে বর্তমান বেলারুশের একটি ছোট্ট শহর Lubavitch থেকে, যেখানে ছাবাড নেতৃত্ব ১৮১৩ থেকে ১৯১৫ পর্যন্ত অবস্থান করেছিল।
উৎপত্তি ও বিকাশ
প্রতিষ্ঠাতা: রাব্বি শ্নেয়ার যালমান অব লিয়াদি (১৭৪৫–১৮১২)
- তিনি হাসিদিক আন্দোলনের প্রথম প্রজন্মের অন্যতম নেতা।
- প্রণয়ন করেন প্রখ্যাত গ্রন্থ Tanya—যা ছাবাড দার্শনিকতার মূল পাঠ্য।
- তাঁর নেতৃত্বে এই ধারা “বুদ্ধিনির্ভর আধ্যাত্মিকতা”র জন্য পরিচিত হয়।
পরবর্তী রেব্বে–শ্রেণি
ছাবাডে মোট সাতজন রেব্বে আছেন। এদের মধ্যে সর্বাধিক প্রভাবশালী:
রাব্বি মেনাহেম মেন্ডেল শনেয়ারসন (১৯০২–১৯৯৪)
- আন্তর্জাতিক মিশনের বিস্তার করেন।
- ছাবাডকে বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপান্তর করেন।
- ইহুদিদের মাঝে ধর্মীয় পরিচয় ও প্র্যাকটিস জাগিয়ে তুলতে “Chabad Houses” গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
- তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কিছু অনুসারী তাঁকে মশিয়াহ (Messiah) ভাবলেও কেন্দ্রীয় ছাবাড নেতৃত্ব এ দাবি সমর্থন করে না।
দর্শন ও বিশ্বাস
১. Chabad Philosophy—বুদ্ধিনির্ভর আধ্যাত্মিকতা
ছাবাড বিশ্বাস করে:
- ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে হলে মানুষের মস্তিষ্কের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
- ধ্যান, চিন্তা, যুক্তি ব্যবহার করে ঈশ্বরীয় সত্যকে বোঝা যায়।
- আবেগের আগে মস্তিষ্ক—অর্থাৎ “Mind over Heart” নীতি।
২. Tanya–ভিত্তিক নৈতিক দর্শন
- মানুষের দুটি আত্মা: ঐশ্বরিক আত্মা ও প্রাণী আত্মা।
- দৈনন্দিন জীবনে এ দ্বন্দ্বকে কাটিয়ে মানুষের কর্তব্য হলো নৈতিক–আধ্যাত্মিক উন্নতি।
৩. ইহুদি আইনের কঠোর অনুসরণ
- কশের খাদ্যনীতি
- সবাথ পালন
- উৎসব, তোরাহ শিক্ষা
- তেফিলিন, মেজুজাহ, মিকভেহ প্রথা
৪. মেসিয়ানিক প্রত্যাশা
- বিশ্বে শান্তি ও ন্যায়ের যুগ আসবে।
- রেব্বের নেতৃত্বে ইহুদি পরিচয়কে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সেই প্রস্তুতি।
ধর্মীয় অনুশীলন
১. হিত্বোনেনুত (Hitbonenut) — চিন্তন/ধ্যান
- নিজের জীবন, আচরণ ও ঈশ্বর উপলব্ধি নিয়ে গভীর মনোযোগ।
- টোরাহ–ভিত্তিক ধ্যান।
২. Joyful Worship
- হাসিদিকদের মতোই নৃত্য, সঙ্গীত, আনন্দ–উচ্ছ্বাসপূর্ণ প্রার্থনা।
৩. Halakha (আইন) অনুসরণে আন্তরিকতা
- অনেক ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম পালন করে, তবে সাধারণ ইহুদিদের কাছে ধর্মকে সহজভাবে পৌঁছানোই তাদের বিশেষত্ব।
বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম
Chabad Houses
- পৃথিবীর প্রায় সকল বড় শহরে ছাবাড হাউস আছে—নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, মুম্বাই থেকে ঢাকা পর্যন্ত।
- ইহুদিদের ধর্মীয়–সামাজিক সেবা কেন্দ্র:
- তোরাহ শিক্ষা
- খাবার সহায়তা
- উৎসব আয়োজন
- যাত্রাপথে ইহুদিদের সহায়তা
- নৈতিক দিকনির্দেশনা
প্রচার–কর্মে আধুনিকতা
- ইন্টারনেট, ভিডিও, ব্লগ, সোশ্যাল মিডিয়া—সবক্ষেত্রে ছাবাডের শক্তিশালী উপস্থিতি।
- অনলাইন প্রশ্নোত্তর, ওয়েবপোর্টাল (Chabad.org) অন্যতম বড় ইহুদি তথ্যভান্ডার।
সমালোচনা ও বিতর্ক
১. মেসিয়ানিক প্রবণতা
- কিছু অনুসারী রেব্বে শনেয়ারসনকে মশিয়াহ দাবি করায় সমালোচনা হয়েছে।
- মূলধারা ইহুদিবাদ এই দাবিকে গ্রহণ করে না।
২. প্রচার–কৌশল
- বিশ্বজুড়ে ছাবাড হাউস পরিচালনায় তাদের “মিশনারি–স্টাইল” কার্যক্রমকে কেউ কেউ অতিরিক্ত মনে করেন।
৩. অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা
- বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনায় আর্থিক উৎস নিয়ে প্রশ্ন থাকে, যদিও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো অপরাধ প্রমাণ হয়নি।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ছাবাড
- দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মায়ানমারসহ পর্যটন–অঞ্চলে ছাবাড খুব সক্রিয়।
- ২০০৮ মুম্বাই হামলায় ছাবাড হাউস টার্গেট হওয়ায় নিরাপত্তা প্রশ্ন জেগেছিল।
বাংলাদেশে কোনো আনুষ্ঠানিক ছাবাড হাউস নেই, তবে ঢাকায় আগত পর্যটক ইহুদিদের মাঝে কিছু অনানুষ্ঠানিক সেবামূলক সংযোগ ছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়।
ছাবাড–লুবাভিচের গুরুত্ব: কেন এই ধারা এত জনপ্রিয়?
১. আনন্দময় আধ্যাত্মিকতা
২. শিক্ষা–মুখী ধর্মভিত্তিক চিন্তা
৩. বিশ্বজোড়া নেটওয়ার্ক ও সেবা
৪. সংস্কৃতিগতভাবে নমনীয়তা (ধর্মীয় কঠোরতার পাশাপাশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সহজ পদ্ধতি)
৫. রেব্বের ব্যক্তিত্ব–নির্ভর নেতৃত্ব
পূর্ববর্তী পর্বঃ Rabbinic vs Karaite








Leave a Reply