ভূমিজ (Bhumij / Bhuimali) নৃগোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রাচীন আদিবাসী গোষ্ঠী, যাদের প্রধান বসবাস ভারতবর্ষের ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িশ্যা এবং কিছু অংশে বাংলাদেশে দেখা যায়। “ভূমিজ” শব্দটির অর্থই হলো “ভূমির সন্তান” বা “মাটির মানুষ”—যা তাদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে এদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায়, বিশেষ করে রাজশাহী ও নওগাঁ অঞ্চলে তাদের বসবাস লক্ষ্য করা যায়।
ঐতিহাসিকভাবে ভূমিজরা অস্ট্রিক বা মুণ্ডা ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের ভাষা “ভূমিজ” বা “ভূমিজী” নামে পরিচিত, যা মুণ্ডারি ভাষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। তবে বর্তমানে অনেক ভূমিজই বাংলা বা আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে থাকে, ফলে তাদের নিজস্ব ভাষা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে।
ভূমিজ সমাজ মূলত পিতৃতান্ত্রিক। পরিবারপ্রধান সাধারণত পুরুষ এবং বংশ পরিচয় পিতার দিক থেকেই নির্ধারিত হয়। তাদের সমাজে বিভিন্ন গোত্র বা ক্ল্যান রয়েছে। একই গোত্রের মধ্যে বিবাহ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এই নিয়মটি সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিয়ের ক্ষেত্রে ভূমিজদের নিজস্ব কিছু ঐতিহ্য রয়েছে। সাধারণত ছেলে ও মেয়ের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়, তবে পরিবারের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিয়ের সময় নাচ-গান, লোকজ বাদ্যযন্ত্র এবং সামাজিক ভোজের আয়োজন করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ‘পণ’ বা কনেপণের প্রথাও দেখা যায়, যেখানে বরের পক্ষ থেকে কনের পরিবারকে কিছু উপহার প্রদান করা হয়।
জীবিকা হিসেবে ভূমিজরা মূলত কৃষিকাজ, দিনমজুরি, বনজ সম্পদ সংগ্রহ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। আগে তারা জুম চাষ বা বননির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক কৃষি ও শহরমুখী কাজের দিকে ঝুঁকেছে। অর্থনৈতিকভাবে তারা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ভূমিজরা মূলত প্রকৃতি পূজারী। তারা সূর্য, চাঁদ, পাহাড়, বন ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিকে দেবতা হিসেবে মানে। পাশাপাশি হিন্দুধর্মের প্রভাবও তাদের মধ্যে দেখা যায়, ফলে অনেক ভূমিজই হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। তাদের প্রধান উৎসবগুলোর মধ্যে “করম পূজা” (Karam Puja) উল্লেখযোগ্য, যেখানে গাছকে কেন্দ্র করে উৎসব পালিত হয় এবং নাচ-গানের মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
বর্তমান সময়ে ভূমিজ নৃগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও পরিচয় টিকিয়ে রাখতে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আধুনিক শিক্ষা, নগরায়ণ ও মূলধারার সংস্কৃতির প্রভাবে তাদের ঐতিহ্য অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের অধিকার ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ভূমিজ জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট ও হালনাগাদ সংখ্যা পাওয়া কঠিন। তবে বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী সিলেট অঞ্চলের চা বাগানগুলোতে তাদের সংখ্যা আনুমানিক ৩,০০০-এর বেশি।
সবশেষে বলা যায়, ভূমিজ নৃগোষ্ঠী বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারা আমাদের সামগ্রিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে এবং এই বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।







Leave a Reply