চাকমা (Chakma) বাংলাদেশের বৃহত্তম আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর একটি। প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় তাদের বসবাস, তবে ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম ও অরুণাচল প্রদেশেও চাকমাদের একটি অংশ রয়েছে।
আগমন ও উৎপত্তি
চাকমাদের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত আছে।
- একদল গবেষকের মতে, তারা প্রাচীন আরাকান (বর্তমান মিয়ানমার) অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে।
- অন্য মত অনুযায়ী, তাদের শিকড় ইন্দো-আর্য ও তিব্বত-বার্মা সাংস্কৃতিক ধারার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিকভাবে চাকমারা একটি সংগঠিত প্রধানতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলে, যেখানে চাকমা রাজা বা প্রধানের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ধর্মবিশ্বাস
চাকমাদের অধিকাংশই থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করে।
- বৌদ্ধ পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দান, প্রবারণা পূর্ণিমা ইত্যাদি তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব।
- বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি লোকজ বিশ্বাস, পূর্বপুরুষপূজা ও প্রকৃতি-সংক্রান্ত আচারও সমাজজীবনে প্রভাব রাখে।
ভাষা
চাকমা ভাষা ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হলেও এতে পালি, সংস্কৃত, আরাকানি ও তিব্বত-বার্মা ভাষার প্রভাব রয়েছে।
তাদের নিজস্ব চাকমা লিপি (Ojhapath) আছে, যদিও বর্তমানে বাংলা লিপির ব্যবহারও ব্যাপক।
সংস্কৃতি ও জীবনযাপন
- ঐতিহ্যবাহী পোশাক: নারীদের পিনন-হাদি, পুরুষদের ধুতি-কামিজ বা লুঙ্গি।
- প্রধান উৎসব: বিজু (বৈসাবি উৎসবের অংশ), যা নতুন বছরকে কেন্দ্র করে তিন দিন ধরে পালিত হয়।
- জীবিকা: আগে প্রধানত জুম চাষ, এখন কৃষি, চাকরি, ব্যবসা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ছে।
- সঙ্গীত, নৃত্য ও লোককথা চাকমা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিক্ষা
চাকমা সমাজে তুলনামূলকভাবে শিক্ষার হার বেশি।
- পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
- উচ্চশিক্ষা, সরকারি চাকরি, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চাকমাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়।
বিবাহরীতি
- সাধারণত সমগোত্রীয় বিবাহ নিষিদ্ধ এবং পারিবারিক সম্মতিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
- বৌদ্ধ ভিক্ষুর আশীর্বাদ ও সামাজিক আচার মিলিয়ে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
- বিয়েতে নৃত্য-গান, ভোজ ও আত্মীয়-স্বজনের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক।
সামাজিক রীতি ও প্রথা
- চাকমা সমাজ ঐতিহ্যগতভাবে গোষ্ঠীভিত্তিক ও প্রধানতান্ত্রিক।
- গ্রাম পরিচালনায় কারবারি ও হেডম্যানের ভূমিকা রয়েছে।
- পারস্পরিক সহযোগিতা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান এবং সামাজিক শৃঙ্খলা তাদের সমাজব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য।
আনুমানিক জনসংখ্যা
বাংলাদেশে চাকমাদের সংখ্যা আনুমানিক ৫–৭ লক্ষের মধ্যে ধরা হয়, যা দেশের সবচেয়ে বড় আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে।
উপসংহার
চাকমা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের ভাষা, বৌদ্ধধর্মভিত্তিক আধ্যাত্মিকতা, বিজু উৎসব, জুম-সংস্কৃতি ও সামাজিক সংগঠন—সব মিলিয়ে তারা একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। আধুনিক শিক্ষা ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেও চাকমারা নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ভারতীয় উপমহাদেশে আদিবাসী বা লোকধর্ম







Leave a Reply