সম্প্রতি বানিজ্য উপদেষ্টা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণের পরিমান ছিলো ২ লক্ষ কোটি টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ লক্ষ কোটি টাকায়। কোনো কোনো প্রচার মাধ্যমে এই পরিমান ২৪ লক্ষ বলে দাবি করা হয়েছে। তবে আসলে এটি সম্পূর্ণটাই বৈদেশিক ঋণ না, বৈদেশিক ও আভ্যন্তরীণ মিলিয়ে সরকারের সর্বমোট ঋণের পরিমান।
বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় একটি প্রবণতা স্পষ্ট—সমস্ত দায় অতীতের সরকারের ওপর চাপিয়ে বর্তমান বাস্তবতাকে আড়াল করা। কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোনো একদিনে থেমে থাকে না, আবার দায়ও সময়ের সঙ্গে স্থির থাকে না। গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের যে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, তার বিপরীতে সম্পদ আহরণ, রাজস্ব আয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা—সবকিছুই তুলনামূলকভাবে কমেছে। এই বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
২০০৯ সালে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭০৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার, যা তখনকার বিনিময় হারে প্রায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। এই সময়ে এবং এর পরে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহাসড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে—অর্থাৎ ঋণের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদ তৈরি হয়েছিলো।
কিন্তু গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ। আর বর্তমানে মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। এই ঋণের বড় অংশই আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ঋণ নেওয়ার গতি বেশি, কিন্তু তার বিপরীতে উৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টি ও রাজস্ব প্রবাহ কম।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো—গত ১৮ মাসে ঋণ বেড়েছে, কিন্তু আভ্যন্তরীণ আয় কমেছে। জাতীয় রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। ঋণ পরিষোধের অঙ্কও সেই অনুপাতে বাড়েনি, ফলে রাষ্ট্র ক্রমেই ঋণচক্রের গভীরে প্রবেশ করছে। এটি আর উত্তরাধিকারজনিত সংকট নয়; এটি চলমান ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার ইঙ্গিত।
এই সময়কালে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে—দুর্নীতি আগের তুলনায় কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। বড় প্রকল্প না থাকলেও প্রশাসনিক ব্যয়, আমদানি-রপ্তানি, ব্যাংকিং ও ঠিকাদারি খাতে অনিয়মের অভিযোগ বাড়ছে। অথচ এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ও দৃঢ় পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। কয়েকজন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত সহকারীর বিরুদ্ধে গুরুতর দূর্নীতির অভিযোগ উঠলেও আজ পর্যন্ত তাদের নামে কোনো মামলা দায়ের হয়নি, কোনো তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়নি।
এখানেই আসে গণমাধ্যমের প্রশ্ন। আজ পর্যন্ত কোনো গণমাধ্যম এ ব্যাপের কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে সাহস পায় নাই। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো আজ কার্যত হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কাজ করছে। প্রকাশনা বন্ধ, মামলা ও প্রশাসনিক চাপের আশঙ্কায় অনেক ক্ষেত্রেই তারা পুরো সত্য প্রকাশ করতে পারছে না। ফলে রাষ্ট্রের আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে আসছে খণ্ডিতভাবে। ঋণের অংকটা বানিজ্য উপদেষ্টা প্রকাশ না করলে অজানাই থেকে যেতো। এই বাস্তবতায় শুধু প্রচলিত গণমাধ্যমের ওপর ভরসা করে সত্য জানা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই কারণেই আজ প্রয়োজন স্বাধীন অনুসন্ধান, বিকল্প বিশ্লেষণ ও নথিভিত্তিক লেখালেখি। রাষ্ট্রের ঋণ, রাজস্ব ও ব্যয়ের হিসাব কেবল সরকারি বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নাগরিক সমাজ, গবেষক ও লেখকদেরই এখন প্রশ্ন তুলতে হবে—এই ঋণ কোথায় যাচ্ছে, কারা লাভবান হচ্ছে, আর দায় বইবে কে।
সত্য কথা হলো, বাংলাদেশের বর্তমান ঋণ সংকট কোনো একটি সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে সমাধান করা যাবে না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য—বর্তমান সরকার সময় পেলেও যদি আয় বাড়াতে, দুর্নীতি কমাতে ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দায় এড়ানোর সুযোগ তাদেরও নেই।
ঋণের অঙ্ক বড় হওয়াই শেষ কথা নয়। শেষ কথা হলো—এই ঋণ রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করছে, নাকি নীরবে তাকে বন্ধক বানাচ্ছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব এখন আর শুধু সরকারের নয়; যারা সত্য লিখতে সাহস করে, তাদেরও।
আরও পড়ুনঃ
(১) আওয়ামীলীগ থাকলে জামায়াত থাকবে, জামায়াত থাকলে আয়ামীলীগ থাকবেঃ মাহফুজ আলম
(২) স্বাধীনতা’৭১ | উদয়ের পথে নিঃশব্দ কারিগর শহীদ বুদ্ধিজীবী এ কে এম নূরুল হক








Leave a Reply