দাসপ্রথার স্বীকৃতি একটি অমানবিক সমাজ ব্যবস্থার দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে সমাজকে
৩১ জানুয়ারি ২০২৬, বিভিন্ন মিডিয়ায় একটি খবর বেরিয়েছে, দাসপ্রথা পূনঃপ্রবর্তনের আইনী স্বীকৃতি দিয়েছে আফগান তালেবান সরকার। ধীরে ধীরে কোন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বিশ্ব তা বিবেকবানরা ভেবে দেখার সুযোগ নাই। এসব ব্যাপারে মুখ খুলতে গেলেই তার সর্বনাশ! নিশ্চিত তাকে তথাকথিত আলেমদের রোসানলে পড়তে হবে। আর পশ্চিমা বিশ্ব এসব আস্কারা ও ইন্ধন দিয়ে দূরে বসে তামাশা দেখছে এবং সুযোগ খুজছে, কিভাবে এদের ধর্মের ভেজাল আফিম খাইয়ে দুর্বল বানিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করা যায়।
ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত শিরোনাম— “আফগানিস্তানে বর্ণ ও দাসপ্রথাকে আইনি স্বীকৃতি, আলেমরা অপরাধ করলে দায়মুক্তি”— এটি কেবল একটি সংবাদ নয়; এটি আফগানিস্তানের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর যে শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা ধীরে ধীরে আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক ধারণা থেকে সরে গিয়ে এক ধরনের ধর্মীয়-জাতিগত শ্রেণিবিন্যাসকে আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করছে।
বর্ণভিত্তিক বিভাজনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
আফগানিস্তান ঐতিহাসিকভাবে বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ— পশতুন, তাজিক, হাজারা, উজবেকসহ নানা সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু তালেবান শাসনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রায় একচেটিয়াভাবে পশতুন-তালেবান গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক আইনি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য কার্যত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।
বিশেষ করে হাজারা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বৈষম্য নতুন নয়। শিক্ষা, চাকরি, জমি অধিকার ও নিরাপত্তা— সব ক্ষেত্রেই তারা বঞ্চনার শিকার। যখন রাষ্ট্রীয় আইন বা ফতোয়ার মাধ্যমে এই বৈষম্যকে নীরবে বা প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন তা বর্ণভিত্তিক শাসনের রূপ নেয়।
দাসপ্রথার ধারণা: আধুনিক বিশ্বে এক ভয়াবহ পশ্চাদপসরণ
খবরে যেভাবে দাসপ্রথার আইনি স্বীকৃতির কথা উঠে এসেছে, তা আফগানিস্তানের সামাজিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আধুনিক বিশ্বে দাসপ্রথা আন্তর্জাতিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। জাতিসংঘের সনদ, মানবাধিকার ঘোষণা— সবই দাসত্বকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
কিন্তু তালেবান শাসনে ধর্মীয় ব্যাখ্যার নামে এমন কিছু সামাজিক সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, যা কার্যত আধুনিক দাসত্বের কাছাকাছি। এটি শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং ইসলামকেও এক বিকৃত রূপে উপস্থাপন করার শামিল।
আলেমদের অপরাধে দায়মুক্তি: আইনের শাসনের অবসান
খবরে উল্লেখিত আরেকটি গুরুতর বিষয় হলো— আলেম বা ধর্মীয় নেতারা অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার না হওয়া। রাষ্ট্র যদি একটি বিশেষ শ্রেণিকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তাহলে সেখানে আইনের শাসন বলে কিছু থাকে না।
এ ধরনের দায়মুক্তি ব্যবস্থার ফলে বিচারব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট হয়, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ে।
ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অপরাধের বিচার না হওয়া ইসলামের ন্যায়বিচারের মূল নীতির সাথেও সাংঘর্ষিক।
তালেবান রাষ্ট্রদর্শন: ধর্ম না ক্ষমতার হাতিয়ার?
তালেবানরা নিজেদের ইসলামি শাসনের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি যেখানে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সাম্য— সেখানে বর্ণভিত্তিক বৈষম্য, দাসত্বের স্বীকৃতি ও দায়মুক্তি কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখানে প্রশ্ন ওঠে— তালেবান কি সত্যিই ধর্মীয় শাসন কায়েম করছে, নাকি ধর্মকে ব্যবহার করে একটি সংকীর্ণ, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখছে?
আন্তর্জাতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সংকট
এই ধরনের আইন ও নীতির ফলে আফগানিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়বে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং সাধারণ জনগণই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে।
বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
উপসংহার
ইত্তেফাকের শিরোনামটি আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতার একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র চিত্র তুলে ধরে। বর্ণ ও দাসপ্রথার আইনি স্বীকৃতি এবং ধর্মীয় নেতাদের দায়মুক্তি কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নয়। এটি একটি সমাজকে ধীরে ধীরে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
আফগানিস্তানের সংকট তাই শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি নৈতিক, মানবিক ও সভ্যতাগত সংকট। এই বাস্তবতাকে নাম ধরে চিহ্নিত না করলে, ‘ধর্মীয় শাসন’ শব্দটি ভবিষ্যতেও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঢাল হয়েই থেকে যাবে।
আরও পড়ুনঃ








Leave a Reply