তঞ্চংগ্যা (Tanchangya) বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। তারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় বসবাস করে। ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারার দিক থেকে তঞ্চংগ্যারা পার্বত্য অঞ্চলের অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে।
আগমন ও উৎপত্তি
তঞ্চংগ্যা জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা করা হয়—
- তারা প্রাচীনকালে আরাকান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সংলগ্ন অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে বর্তমান বসতিতে স্থায়ী হয়।
- ইতিহাসে চাকমা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়, যদিও সময়ের সঙ্গে তারা আলাদা সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলে।
- গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজব্যবস্থা ও পাহাড়নির্ভর জীবনযাপন তাদের ঐতিহ্যের মূল অংশ।
ধর্মবিশ্বাস
তঞ্চংগ্যাদের অধিকাংশই থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করে।
- বৌদ্ধ পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দান, প্রবারণা পূর্ণিমা ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসব তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।
- পাশাপাশি কিছু লোকবিশ্বাস, পূর্বপুরুষ স্মরণ ও প্রকৃতি-সংক্রান্ত আচার সামাজিক সংস্কৃতিতে বিদ্যমান।
ভাষা
তঞ্চংগ্যা ভাষা ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর প্রভাবযুক্ত একটি স্বতন্ত্র ভাষা, যা চাকমা ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
- দৈনন্দিন যোগাযোগে বাংলা ভাষার ব্যবহারও বাড়ছে।
- ভাষা সংরক্ষণে সাংস্কৃতিক উদ্যোগ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সংস্কৃতি ও জীবনযাপন
- ঐতিহ্যবাহী পোশাক: নারীদের বোনা কাপড়ভিত্তিক পোশাক এবং পুরুষদের সরল লুঙ্গি বা ধুতি-ধরনের পোশাক।
- প্রধান উৎসব: বৈসাবি উৎসব, যা নববর্ষকে কেন্দ্র করে আনন্দঘন পরিবেশে পালিত হয়।
- জীবিকা: ঐতিহ্যগতভাবে জুম চাষ, পাশাপাশি কৃষিকাজ, মাছধরা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা।
- লোকসংগীত, নৃত্য, বয়নশিল্প ও সামষ্টিক উৎসব তঞ্চংগ্যা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিক্ষা
তঞ্চংগ্যা সমাজে আগে শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল—
- দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এর কারণ।
- বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শিক্ষার হার ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং নতুন প্রজন্ম বিদ্যালয়মুখী হচ্ছে।
বিবাহরীতি
- সাধারণত গোষ্ঠীর ভেতরে পারিবারিক সম্মতিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
- বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার ও সামাজিক অনুষ্ঠানের সমন্বয়ে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
- ভোজ, গান ও আত্মীয়স্বজনের অংশগ্রহণ সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
সামাজিক রীতি ও প্রথা
- তঞ্চংগ্যা সমাজ গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ও প্রথানির্ভর।
- গ্রামপ্রধান, বয়োজ্যেষ্ঠদের পরামর্শ ও পারস্পরিক সহযোগিতা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখে।
- ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আচার সমাজজীবনের কেন্দ্রীয় অংশ।
আনুমানিক জনসংখ্যা
বাংলাদেশে তঞ্চংগ্যা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ৪০–৬০ হাজারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।
উপসংহার
তঞ্চংগ্যা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৌদ্ধধর্মভিত্তিক আধ্যাত্মিকতা, বৈসাবি উৎসব, জুমজীবন ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামো তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছে। আধুনিক শিক্ষা ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেও তারা নিজেদের সংস্কৃতি সংরক্ষণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
আরও পড়ুনঃ ম্রো বা মুরং জনগোষ্ঠী: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের পরিচিতি






Leave a Reply