আমার একজন দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন—কথার মাঝে ঘন ঘন একটি বাক্য ব্যবহার করতেন: “মনে করেন যে”। প্রথমে শুনে হাসি পেতো। পরে একদিন একটা কাজের প্রয়োজনে তার কাছে গেলাম। ব্যাখ্যার পর ব্যাখ্যা, আর প্রতিটি বাক্যের মাঝখানে সেই একই কথা—“মনে করেন যে”। একসময় বিরক্ত হয়ে স্বাভাবিকভাবেই বলে ফেললাম, ভাই, খালি মনে করলে তো হবে না, কাজটা করতে হবে। তিনি থতমত খেয়ে এক মুহূর্ত থেমে একটু ভেবে বললেন, আচ্ছা, করে দিচ্ছি।
এই “মনে করেন যে” বাক্যটা এরপর থেকে আমার কাছে একটা রূপক হয়ে আছে। ইদানিং এটার একটু আধটু প্রয়োগ করছি, বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিত্তে মনে কৌতুহল জাগায় এমন রাজনীতির আলোচনায়। আজ আলোচনা করা যাক সম্ভাব্য ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন প্রসঙ্গে।
ভোটের অঙ্ক: একটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
১৯৯১ সাল থেকে লক্ষ্য করে আসছি—বাংলাদেশের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মিলিয়ে সাধারণত মোট ভোটারের প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ ভোট পায়। বাকি অংশটা ভাগ হয়ে যায় ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে।
আরও একটু পেছন দিকে তাকাই। আমি ১৯৭০ সালে প্রথম ভোটার হই এবং সাধারণ নির্বচনে তৎকালিন জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ভোট প্রয়োগ করি। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত একটি বিষয় বেশ ধারাবাহিক—জামায়াতে ইসলামীর ভোটব্যাংক সাধারণত ৭–১০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এই ভোটের ভিত্তিতে তাদের সংসদে প্রতিনিধিত্বও সীমিত ছিলো—সাধারণত ২–৪টি আসন। ব্যতিক্রম হয়েছে কিছু নির্বাচনে, যেমন ২০০১ সালে, যেখানে রাজনৈতিক সমঝোতা ও পরিস্থিতির কারণে আসনসংখ্যা তুলনামূলক বেশি হয়েছিলো।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: জটিল সমীকরণ
এখনকার পরিস্থিতিতে এসে যদি অনুমান করি—
আওয়ামী লীগ কার্যত মাঠের বাইরে, বিএনপি চাপের মুখে; রাজনৈতিকভাবে তারা কোণঠাসা, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
এদিকে রাষ্ট্রক্ষমতার ভেতরে-বাইরে একটি ভিন্ন হিসাবও চলছে—এমন একটি রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরি করা, যেখানে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিশ্চিত থাকবে এবং অন্তত পাঁচ বছর বড় ধরনের অস্থিরতা এড়ানো যাবে। এই লক্ষ্য পূরণে কখনো নতুন রাজনৈতিক শক্তি, কখনো পুরোনো মিত্র—নানা বিকল্প নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে এই নির্ভরতার পাল্লা জামায়াতের দিকেই কিছুটা ঝুঁকছে—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।
ভোটার মনস্তত্ত্ব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
এই অবস্থায় দোদুল্যমান ভোটারদের একটি অংশ অনিচ্ছাসত্ত্বেও জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
ধরে নেয়া যাক, জামায়াত যদি ১০–১৫ শতাংশ ভোট টানতে সক্ষম হয়, এবং আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় বা দুর্বল থাকায় এই হার শরিকদের নিয়ে ১৫–২০ শতাংশে পৌঁছে যায়। এর সঙ্গে যদি আসন বণ্টনে কৌশলগত সুবিধা যুক্ত হয়, তাহলে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে, যেখানে বিএনপি সরকার গঠনের মতো আসন পেলো না।
বিএনপি মাঠ ছাড়লে কী হতে পারে?
আরও এক ধাপ এগিয়ে যদি ভাবি—
বিএনপি হয় পরাজয়ের আশঙ্কায়, ভোটের আগেই নির্বাচন বর্জন করলো, নয়তো ফলাফল নিয়ে অনাস্থা থেকে ভোটের মাঝপথে বর্জন করলো।
খেলার ভাষায়, যে দল জেতার সম্ভাবনা রাখে, তারা মাঠ ছেড়ে দিলে সেটি নিছক হার নয়—তা এক ধরনের প্রতিবাদ। আর রাজনীতিতে প্রতিবাদ মানেই শেষ পর্যন্ত আন্দোলন।
বিএনপির আন্দোলনের ইতিহাস বলছে—এ আন্দোলন সাধারণত ভোট বা নির্বাচনী ফলাফল বর্জনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়।
শেষ প্রশ্ন: চাপ সামলানো যাবে তো?
এখন শেষ একটি অনুমানই করা যাক—
যদি বিএনপির আন্দোলন সত্যিই বেগবান হয়, আর সেই রাজনৈতিক শূন্যতা যদি সহিংস বা উগ্র গোষ্ঠী কাজে লাগাতে চায়, তাহলে কি হতে পারে? কিংবা যদি বিএনপির আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয় ভোট থেকে বঞ্চিত ভোটাররা, যাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নাই, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সাধারণ ভোটার বা সমর্থক- সেক্ষেত্রে ৮০–৮৫ শতাংশ সাধারণ মানুষের চাপ কেবল মব বা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সামাল দেয়া সম্ভব হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট—রাজনীতি শুধু “মনে করার” বিষয় নয়। বাস্তবতা উপেক্ষা করে করা হিসাব শেষ পর্যন্ত সংকটই বাড়ায়।
অন্তর্বর্তী সময়ের ভালোর কথা ভেবেই এই ভাবনা।
মনে করতে তো আর ট্যাক্স লাগে না—তাই, মনে করেই দেখা যাক।
_____________________________________________________________________________








Leave a Reply