চীনের ইতিহাসে “অমরত্ব” ছিল শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা। বহু সম্রাট বিশ্বাস করতেন—বিশেষ ভেষজ ও খনিজের সংমিশ্রণে তৈরি ‘অমরত্বের ওষুধ’ সেবন করলে তারা চিরজীবী হতে পারবেন। এই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষক্রিয়ায়।
প্রাচীন চীনা তাওবাদী আলকেমিতে পারদ (Mercury) ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ধারণা ছিল, পারদ শরীরে প্রবেশ করলে তা জীবনশক্তিকে স্থায়ী করে তোলে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে জানা যায়—পারদ মারাত্মক বিষ, যা স্নায়ুতন্ত্র ধ্বংস করে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ চীনের প্রথম সম্রাট ছিন শি হুয়াং। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে তিনি অমরত্বের সন্ধানে পারদমিশ্রিত ওষুধ নিয়মিত সেবন করতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই পারদই তার হঠাৎ মৃত্যুর অন্যতম কারণ। মৃত্যুর পরও তাকে ‘অমর’ করে রাখার প্রয়াসে সমাধিতে পারদের নদী পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছিল—যার প্রমাণ আধুনিক গবেষণায় মিলেছে।
ছিন শি হুয়াং একা নন। হান, তাং ও মিং রাজবংশের একাধিক সম্রাট একই বিশ্বাসে পারদসেবন করেন। তাং রাজবংশের সম্রাট তাং শুয়ানজং এবং তাং শিয়েনজং—দুজনের মৃত্যুর পেছনেও পারদজাত ওষুধের ভূমিকার কথা ঐতিহাসিক দলিলে পাওয়া যায়। অমরত্বের আশায় নেওয়া এই ‘ওষুধ’ তাদের শরীরে সৃষ্টি করেছিল উন্মত্ততা, স্মৃতিভ্রংশ, পক্ষাঘাত এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু।
চীনের এই ইতিহাস মানবসভ্যতার এক নির্মম ব্যঙ্গচিত্র তুলে ধরে। ক্ষমতার চূড়ায় বসেও মানুষ মৃত্যুকে জয় করতে পারেনি; বরং মৃত্যুকে ঠেকাতে গিয়ে আরও দ্রুত ডেকে এনেছে মৃত্যু।
অমরত্বের স্বপ্নে পারদ সেবন করা চীনা সম্রাটদের কাহিনি তাই শুধু ইতিহাস নয়—এটি মানুষের সীমাহীন লোভ, ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং বিজ্ঞানের অজ্ঞতার এক ভয়াবহ শিক্ষাও বটে।
আরও পড়ুনঃ কাগজে সই করতে জানতেন না চেঙ্গিস খান








Leave a Reply