ইসলামি চিন্তাজগতে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত যে প্রশ্নগুলো ঘুরে ফিরে এসেছে, তার একটি হলো—
হাদিসভিত্তিক সালাফি চিন্তা বনাম চার মাজহাবের ঐতিহ্যগত ফিকহি কাঠামো।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে যাঁর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত, তিনি হলেন শাইখ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
এটা কি সত্যিই “আলবানী বনাম চার মাজহাব”?
নাকি এটি মূলত পদ্ধতির পার্থক্য, যা ভুলভাবে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে?
চার মাজহাব: ধর্ম নয়, ধর্ম বোঝার ঐতিহ্য
হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—এই চার মাজহাব ইসলামের চারটি আলাদা ধর্মীয় সংস্করণ নয়।
বরং এগুলো হলো—
- কুরআন ও সুন্নাহ বোঝার প্রাতিষ্ঠানিক ও ইজতিহাদি কাঠামো
- ভিন্ন ভিন্ন সময়, সমাজ ও বাস্তবতায় গড়ে ওঠা আইনগত স্কুল
- শত শত বছরের আলেমি চর্চা, ইজমা ও অভিজ্ঞতার সমষ্টি
চার ইমামই স্পষ্ট করে বলেছেন—
“আমার কথা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর বিপরীত হলে, আমার কথাই বর্জনযোগ্য।”
অর্থাৎ, মাজহাবের দাবি কখনোই অন্ধ অনুসরণ নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত অনুসরণ।
আলবানী: হাদিস-কেন্দ্রিক সংস্কারবাদী চিন্তা
শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানী ছিলেন মূলত একজন হাদিস বিশারদ।
তার কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—
- সহিহ, দঈফ (জইফ) ও জাল হাদিস আলাদা করে চিহ্নিত করা
- বহু প্রচলিত আমলের দলিল নতুন করে যাচাই করা
- দুর্বল হাদিসের উপর দাঁড়ানো ফতোয়ার সমালোচনা করা
তার মূল বক্তব্য ছিল খুব সরল—
“সহিহ হাদিস থাকলে, সেটাই গ্রহণযোগ্য—ব্যক্তি বা মাজহাব নির্বিশেষে।”
এই বক্তব্য শুনতে সহজ হলেও, এর বাস্তব প্রভাব ছিল গভীর ও স্পর্শকাতর।
দ্বন্দ্বের মূল জায়গা: দলিল বনাম কাঠামো
এখানেই শুরু হয় আসল দ্বন্দ্ব।
চার মাজহাব যেখানে—
- একটি হাদিসের পাশাপাশি
- সাহাবিদের আমল,
- ইজমা,
- কিয়াস,
- সামাজিক বাস্তবতা—
সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়,
আলবানীর পদ্ধতি সেখানে—
- প্রথমে হাদিসের সহিহতা বা সঠিকতা যাচাই করে
- যদি কোনো ফিকহি সিদ্ধান্ত দুর্বল হাদিসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেটি বাতিল করেন
এটি সরাসরি মাজহাব অস্বীকার নয়,
বরং হাদিসকে সর্বোচ্চ মানদণ্ডে বসানো।
ঐতিহ্যগত আলেমদের আপত্তি
অনেক প্রথাগত আলেম আলবানীর কাজকে স্বাগত জানালেও আপত্তি তুলেছেন কয়েকটি জায়গায়—
- হাদিস সহিহ হলেও তা কীভাবে, কোন প্রেক্ষিতে প্রয়োগ হবে—এই ফিকহি দিকটি উপেক্ষিত হয়েছে
- শতাব্দীর পর শতাব্দীর ইজতিহাদকে একক হাদিসের ভিত্তিতে বাতিল করা ঝুঁকিপূর্ণ
- সাধারণ মুসলমানরা মাজহাব পরিত্যাগ করে নিজেকে সিদ্ধান্তদাতা ভাবতে শুরু করেছে
এই কারণেই বহু আলেম বলেছেন—
আলবানী হাদিসে শক্তিশালী, কিন্তু ফিকহ-এ সীমাবদ্ধ।
সমস্যা কি আলবানীতে, না অনুসারীদের আচরণে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আছে।
আলবানী নিজে কখনো বলেননি—
- মাজহাব মানা হারাম
- বা মাজহাব বাতিল করা জরুরি
কিন্তু তার কিছু অনুসারী—
- মাজহাবকে “অপ্রয়োজনীয়”
- বা “ভুল ঐতিহ্য” হিসেবে তুলে ধরেছেন
ফলে একটি পদ্ধতিগত আলোচনা রূপ নিয়েছে দলগত সংঘাতে।
উপসংহার: দ্বন্দ্ব নয়, ভারসাম্যের প্রয়োজন
বাস্তবতা হলো—
- চার মাজহাব ছাড়া মুসলিম সমাজে আইনি শৃঙ্খলা তৈরি হতো না
- আবার হাদিস যাচাই ছাড়া মাজহাব চর্চাও নিরাপদ নয়
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন—
দলিলকে ব্যবহার করে ঐতিহ্য ভাঙা হয়
অথবা
ঐতিহ্যের অজুহাতে দলিল উপেক্ষা করা হয়
আলবানী বনাম চার মাজহাব—এই দ্বন্দ্ব আসলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়,
এটি হলো দলিল ও ঐতিহ্যের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার সংগ্রাম।
আরও পড়ুনঃ








Leave a Reply