কমলালেবু আর বিড়ি ব্যবসা থেকে রাষ্ট্রচিন্তা

শেখ আকিজ উদ্দিন—বাংলার উদ্যোক্তা জগতের এক পরিচিত নাম। কিশোর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে কলকাতার হাওড়া স্টেশনে কমলালেবু বিক্রি থেকে শুরু। কেউ এটাকে দারিদ্র্য বলবে, কেউ বলবে সংগ্রাম। তবে ব্যবসায়িক জীবনীতে এটি এখন “সাম্রাজ্য উৎপত্তির গল্প” নামে পরিচিত। সেখান থেকেই শুরু—যশোরে ফেরা, বিড়ির ব্যবসা, তারপর ‘আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি’। ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়াতে থাকে স্বপ্নও। বিড়ির ধোঁয়া একসময় […]

শেখ আকিজ উদ্দিন—বাংলার উদ্যোক্তা জগতের এক পরিচিত নাম।

কিশোর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে কলকাতার হাওড়া স্টেশনে কমলালেবু বিক্রি থেকে শুরু। কেউ এটাকে দারিদ্র্য বলবে, কেউ বলবে সংগ্রাম। তবে ব্যবসায়িক জীবনীতে এটি এখন “সাম্রাজ্য উৎপত্তির গল্প” নামে পরিচিত।

সেখান থেকেই শুরু—যশোরে ফেরা, বিড়ির ব্যবসা, তারপর ‘আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি’। ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়াতে থাকে স্বপ্নও।

বিড়ির ধোঁয়া একসময় সীমা ছাড়ায়। পাট, বস্ত্র, সিমেন্ট, সিরামিক, খাদ্য, ওষুধ, প্যাকেজিং—কি নেই!

১৯৭০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত ‘আকিজ গ্রুপ’ আজ বাংলাদেশের শিল্পমানচিত্রে এক বিশাল ছায়া। বলা যায়, কমলালেবু থেকে কংক্রিট—দূরত্বটা বেশ লম্বা, কিন্তু যাত্রাটা মসৃণ।

এই সফলতার ধারাবাহিকতায় পরিবারের পরবর্তী অধ্যায়—শেখ বশির উদ্দিন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবার ব্যবসায় যুক্ত হওয়া। এই বয়সে অন্যরা যেখানে অঙ্কের গুণের নামতা মুখস্থ করে, সেখানে তিনি মুখস্থ করেছেন হিসাবের খাতা।

অভিজ্ঞতা আসে দ্রুত, প্রভাব আসে স্বাভাবিকভাবেই। আজ তিনি বর্তমান ইউনূস সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা—রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ আসনে।

সম্প্রতি শেখ বশির উদ্দিন প্রশ্ন তুলেছেন—পদ্মা সেতু নির্মাণের কারণে নাকি চালের দাম বেড়ে গেছে। প্রশ্নটা শুনে সাধারণ মানুষ একটু থমকে যায়। কারণ, এতদিন তারা ভেবেছিল চালের দাম বাড়ে বন্যায়, খরায়, সিন্ডিকেটে, মজুতদারিতে, জ্বালানির দামে, ডলারের রেটে এবং সরবরাহের অব্যবস্থাপনায়—কিন্তু সেতুতে?

পদ্মা সেতু—যেটা গ্রামের কৃষককে শহরের বাজারে পণ্য পৌঁছাতে সময় কমিয়েছে, পরিবহন খরচ কমিয়েছে, পণ্য চলাচল সহজ করেছে—সেই সেতুই নাকি চালের দামের মূল অভিযুক্ত! যেন সেতুর পিলারের নিচে লুকিয়ে আছে চালের বস্তা, আর স্প্যান বসালেই দাম লাফিয়ে ওঠে।

ব্যাপারটা আরও মজার হয় যখন ভাবি—একজন শিল্পগোষ্ঠীর উত্তরসূরি, যার ব্যবসা বিস্তারের পেছনে অবকাঠামো, সড়ক, বিদ্যুৎ, যোগাযোগের অবদান অস্বীকার করা যায় না, তিনিই কিনা অবকাঠামোর বিরুদ্ধে এমন সরল সমীকরণ হাজির করেন! যেন উন্নয়ন নিজেই মূল্যস্ফীতির একমাত্র খলনায়ক, আর বাজারব্যবস্থার অন্য সব চরিত্র নিষ্পাপ।

এখানে ব্যাঙ্গটা আসলে সেতুতে নয়, দৃষ্টিভঙ্গিতে। প্রশ্ন তোলা অবশ্যই দরকার—কিন্তু প্রশ্ন যদি বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারায়, তখন তা বিশ্লেষণ নয়, শিরোনাম হয়ে ওঠে।

পদ্মা সেতু যদি চালের দাম বাড়ায়, তবে হয়তো আগামীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ডিমের দাম বাড়াবে, আর ইন্টারনেটের গতি বাড়লে পেঁয়াজের কেজিও চড়া হবে।

শেখ আকিজ উদ্দিনের জীবন আমাদের শিখিয়েছে—সংগ্রাম থেকে শিল্প, ছোট উদ্যোগ থেকে বৃহৎ কাঠামো গড়ে ওঠে। সেই কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আজ যারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখেন, তাদের কাছ থেকে মানুষ আরও সংযত, তথ্যভিত্তিক আর দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ আশা করে।

কারণ, কমলালেবু বিক্রি করে যে ইতিহাস শুরু হয়েছিল, তা ব্যাঙ্গের নয়—প্রেরণার। আর সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকারীদের কথাও হওয়া উচিত সেতুর মতোই দৃঢ়, বাস্তবতার সঙ্গে যুক্তিযুক্ত।

নইলে মানুষ প্রশ্ন করবেই—চালের দাম সত্যিই কি বাড়ে সেতুতে, নাকি বাড়ে কথার ওজনে?

আরও পড়ুনঃ যাত্রাপালার খল চরিত্র ও আজকের বাস্তবতা: সমাজ কি শেষ দৃশ্যের অপেক্ষায়?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top