কেদার সাপুড়ে: লোককথা, বাস্তবতা এবং এক নির্মম পরিণতি

বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে যাদের বাড়ি এবং বয়স ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে, তারা কেদার সাপুড়ের নাম নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন।

কেদার সাপুড়ে ছিলেন ওই অঞ্চলের এক সময়ের বিখ্যাত সাপুড়ে। তার পেশা ছিল সাপ খেলা দেখানো। দলে থাকতো ১৫–২০ বছর বয়সী দুই–তিনজন ছেলে এবং কালো ও সাদা রঙের প্রায় দশটির মতো গোখরো সাপ।

খেলা দেখানোর সময় কেদার সাপুড়ে এমন কিছু কাণ্ড ঘটাতেন, যা দর্শকদের হতবাক করে দিত। একপর্যায়ে তিনি একটি সাপের মাথা নিজের মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিতেন। আবার আরেকটি সাপ দিয়ে দলের একজন ছেলেকে হাতে কামড় দিতে বলতেন। ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে পড়তো। এরপর কেদার সাপুড়ে ঝাড়ফুঁক শুরু করতেন এবং কিছুক্ষণ পর ছেলেটি ‘বিষ নামার’ পর জীবিত হয়ে উঠতো।

এই পুরো নাটকীয় দৃশ্যের সুযোগে মানুষের দুর্বল আবেগকে কাজে লাগিয়ে তিনি টাকা-পয়সা আদায় করতেন।

আমরা তখন এসব নিয়ে ভাবতাম। বিভিন্ন মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করে যা জানা গিয়েছিল, তা মূলত দুইটি ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল—

এক. প্রতিদিন সকালে তিনি প্রতিটি সাপের বিষ দাঁত ভেঙে দিতেন। ফলে সাপ কামড়ালেও ছেলেটির কোনো ক্ষতি হতো না। পুরো ঘটনাটাই ছিল অভিনয়।

দুই. যে সাপটির মাথা তিনি মুখে ঢোকাতেন, তার দুই চোয়াল চিকন নাইলন সুতা দিয়ে সেলাই করা থাকতো।

একসময় কেদার সাপুড়ে আমাদের এলাকায় আর আসতেন না। পরে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়—খেলা দেখানোর সময় সাপের কামড়েই তার মৃত্যু হয়েছে।

তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে তখন মূলত দুটি মত প্রচলিত ছিল—

এক. সেদিন তিনি বিষ দাঁত ভাঙতে ভুলে গিয়েছিলেন।

দুই. বিষ দাঁত ভাঙা হলেও তা খুব দ্রুত আবার গজিয়ে যায়—এমন মতও অনেকে দিয়েছিলেন।

বর্তমান সময়ে এসে তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, দ্বিতীয় মতটির পক্ষেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বেশি শক্তিশালী। যা জানা গেছে তা হলো—

“বিষধর সাপের প্রতিটি বিষ দাঁতের পেছনে একাধিক (১ থেকে ৬টি পর্যন্ত) দাঁত বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকে। একটি দাঁত ভেঙে গেলে বা পড়ে গেলে পরবর্তী দাঁতটি খুব সহজেই সেই জায়গাটি দখল করে নেয়।”

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—

“সাপের বিষ দাঁত ভেঙে গেলে নতুন দাঁত খুব দ্রুত, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর অবস্থানে চলে আসে। কারণ তাদের দাঁত পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপিত হয়। একটি নষ্ট হলে পেছনের দাঁত সামনে চলে আসে।”

এই দাঁতের শূন্যস্থান পূরণ অনেক ক্ষেত্রে একদিন বা দুদিন সময় নিতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ঘটতে পারে।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সারাজীবন ধরে শুনে আসা একটি প্রচলিত বাক্য—

“সাপের হাতেই সাপুড়ের মৃত্যু হয়।”

এই কথাটির বাস্তব প্রমাণ যেন এখানেই মিলে যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top