রাজা তৃতীয় জর্জের ‘নীল মূত্র’ রহস্য!
ব্রিটিশ ইতিহাসে রাজা তৃতীয় জর্জ (George III), যার রাজত্বকাল ছিলো ১৭৬০ থেকে ১৮২০ সাল – ছিলেন এক অদ্ভুত ও বিতর্কিত সম্রাট। তাঁর রাজত্বকালে আমেরিকান উপনিবেশ হারানো, নেপোলিয়নিক যুদ্ধ, কৃষি ও বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহ—সবই ইতিহাসে আলোচিত। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় দিকগুলোর একটি হলো তাঁর মূত্র নীল রঙের হয়ে যাওয়া, যা নিয়ে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গবেষণা, বিতর্ক ও চিকিৎসা-রহস্য অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ঐতিহাসিক নথি থেকে জানা যায়, রাজা জর্জ তৃতীয় মাঝে মাঝে অত্যন্ত অস্বাভাবিক আচরণ করতেন। অতিরিক্ত কথা বলা, বিক্ষিপ্ত ভাবনা, হঠাৎ উল্লাস, আবার গভীর বিষণ্ণতা। এ সময় থেকেই চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করেন, তাঁর মূত্র নীলচে কিংবা বেগুনি রঙের।
এই অস্বাভাবিকতার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা তাঁর রোগ সম্পর্কে দুটি সম্ভাব্য তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন—
(১) পোরফিরিয়া (Porphyria) রোগ তত্ত্ব
বেশ কয়েকজন গবেষকের মতে, জর্জ তৃতীয় acute intermittent porphyria নামক বিরল রোগে ভুগছিলেন। এই রোগে শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরির রাসায়নিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং নির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদান মূত্রে জমে নীলচে-বেগুনি রঙ তৈরি করতে পারে।
রোগের লক্ষণ ও রাজার আচরণ—
- হঠাৎ মানসিক উন্মাদনা
- অস্থিরতা ও অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা
- উচ্চ স্বরে দীর্ঘ সময় কথা বলা
- অদ্ভুত সিদ্ধান্ত ও আবেগপ্রবণতা
এসবই তাঁর জীবনের শেষ দিকে বারবার দেখা গেছে, যা পোরফিরিয়ার সঙ্গে মিলে যায়।
কিছু চিকিৎসক বলেন, আগের যুগে ব্যবহৃত পেনিসিলিন জাতীয় ওষুধ কিংবা অ্যান্টিমনি সমৃদ্ধ চিকিৎসা এই প্রতিক্রিয়া আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাবে তাঁর মূত্র নীল হতো।
(২) আর্সেনিক বিষক্রিয়া তত্ত্ব
আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়—রাজার চুলের নমুনা বিশ্লেষণে উচ্চ মাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে। আর্সেনিক দীর্ঘস্থায়ী গ্রহণে স্নায়ুতন্ত্র দুর্বল হয়, মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং শরীরের বিভিন্ন রঙের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। আধুনিক গবেষকেরা বলছেন—
- আর্সেনিক হয়তো ইচ্ছাকৃত বিষ নয়
- সে সময়ের অনেক ওষুধেই আর্সেনিক ব্যবহার হতো
- বিষক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে মানসিক অসুস্থতা তৈরি করতে পারে
- ফলস্বরূপ মূত্রের রঙে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটতে পারে
তাহলে সত্য কী?
এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না তাঁর নীল মূত্রের প্রকৃত কারণ কী ছিল।
তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো—
জর্জ তৃতীয় সম্ভবত পোরফিরিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এবং চিকিৎসায় ব্যবহৃত আর্সেনিক তাঁর শারীরিক প্রতিক্রিয়া আরও অস্বাভাবিক করে তুলেছিল।
অর্থাৎ উভয় কারণ মিলেই তাঁর মূত্র নীল রঙ ধারণ করেছিল—এমনটাই বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করেন।
রাজা জর্জের পাঠ আমাদের কী শেখায়
ইংল্যান্ডের রাজা জর্জ তৃতীয়ের ঘটনা শুধু হাস্যকর চিকিৎসা-বিস্ময় নয়, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজ আমরা জানি, মানসিক রোগ ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া কত গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
যে মানুষটি আধুনিক ব্রিটেনের রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে দিয়েছিলেন, তাঁর জীবনের শেষ অংশ কেটে যায় বিভ্রান্তি, শারীরিক দুর্বলতা ও অদ্ভুত রোগের অভিশাপে।








Leave a Reply