মুক্তিযুদ্ধ – ১৯৭১

১৯৭১ সালের এই ছবিটিতে আছেন ৯৯ বছরের একজন বৃদ্ধা এবং তার ৭৯ বছর বয়সী সন্তান। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন (অক্টোবর ৭১) সীমান্ত সংলগ্ন বনগাঁও এলাকা দিয়ে ভারতের বাগদা’য় প্রবেশের মুহূর্তে ফটোগ্রাফার সন্তোষ বসাক এই দুর্লভ ছবিটি তোলেন। 

বসাক সেই লোকটিকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘কে এই বৃদ্ধা মহিলা?’ উত্তরে লোকটি জানায়, ‘তিনি আমার মা। আমার মা এখন একটি শিশুর মতো। তিনি ঠিকমতো হাটতেও পারেন না। এই অবস্থায় আমি তাকে ছেড়ে কিভাবে যাই!!’  

উল্লেখ্য, এই ছবিটি পরবর্তীতে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো -১৯৮২ পুরস্কার লাভ করে।

১৯৭১ সালের এই হৃদয়স্পর্শী ছবিটিতে দেখা যায় ৯৯ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা মা এবং তাঁর ৭৯ বছর বয়সী সন্তানকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ সময় ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন, হত্যা আর আগুনে পুড়তে থাকে বাংলাদেশ। নিজ ভূমি, নিজ গৃহ ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ পাড়ি জমাত থাকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। সবার মতো তারাও ছুটছিলেন সীমান্তের দিকে জীবন বাঁচানোর আশায়।

সীমান্ত সংলগ্ন বনগাঁ এলাকা দিয়ে ভারতের বাগদায় প্রবেশের মুহূর্তে আলোকচিত্রী সন্তোষ বসাক এই অসাধারণ মানবিক ছবিটি ধারণ করেন। পরে তিনি বৃদ্ধ লোকটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“কে এই বৃদ্ধা মহিলা?”

লোকটি শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন- “তিনি আমার মা। এখন তিনি ছোট শিশুর মতো হয়ে গেছেন। ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। এই অবস্থায় আমি তাকে ফেলে কিভাবে যাই?”

এই একটি উত্তরই পুরো মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতার ইতিহাসকে ধারণ করে। যুদ্ধ শুধু রণাঙ্গনের গল্প নয়; যুদ্ধ মানে পরিবার হারানোর ভয়, মায়ের হাত না ছাড়ার অঙ্গীকার, আর মৃত্যুভয়ের মাঝেও মানবতার শেষ আশ্রয়টুকু ধরে রাখার সংগ্রাম।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের এককোটিরও বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। কেউ সন্তানকে কাঁধে নিয়েছে, কেউ বৃদ্ধ বাবাকে, কেউ অসুস্থ মাকে। এই ছবিটি সেই অগণিত নিরুপায় মানুষের প্রতীক। তারা ঘর হারিয়েছিলো কিন্তু মানবিকতা হারায়নি।

ছবিটির আবেগ, বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে এটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে ছবিটি ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো পুরস্কারে’ স্বীকৃতি লাভ করে। আজও ছবিটি মুক্তিযুদ্ধের মানবিক দিকের এক অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু অস্ত্রধারীদের নয়; ইতিহাস তাদেরও, যারা মাকে বাঁচাতে নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সীমান্ত পেরিয়েছিল।

2 thoughts on “মুক্তিযুদ্ধ – ১৯৭১”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top